আলী খামেনির জানাজায় জনসমুদ্র তেহরান
ছবি: সংগৃহীত
০৮:৫৮ পিএম | ০৪ জুলাই, ২০২৬
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিতে রাজধানী তেহরানে সমবেত হয়েছেন লাখ লাখ মানুষ।
শুক্রবার (৩ জুন) থেকে শুরু হওয়া প্রায় সপ্তাহব্যাপী এই শোকানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি নিজেদের কঠোর প্রতিরোধ ও চ্যালেঞ্জের বার্তা দিতে চাইছে দেশটির প্রশাসন।
শিয়া ঐতিহ্যের প্রতিশোধ ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে কালো পোশাক পরিধান করে এবং ‘রক্ত-লাল’ পতাকা হাতে নিয়ে অনুগত জনতা তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় প্রাঙ্গণে এসে ভিড় জমান। ১৯৮৯ সাল থেকে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক ধরে ইরান শাসন করা খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনে সপরিবারে ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সে নিহত হন।
দীর্ঘ শাসনামলে তিনি একদিকে যেমন পশ্চিমাদের সাথে তীব্র সংঘাতের নীতি বজায় রেখেছিলেন, তেমনি দেশের অভ্যন্তরে যেকোনো ভিন্নমত কঠোরভাবে দমন করেছিলেন।
তীব্র গরম এবং প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে মোসাল্লা প্রাঙ্গণে সমবেত হাজার হাজার নারী ও পুরুষকে শীতল রাখতে কৃত্রিমভাবে পানি ছিটানো হচ্ছে। কঠোর লিঙ্গ-বিভাজন মেনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শোকাতুর জনতা বুক চাপড়ে তাদের প্রিয় নেতার প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করছেন। মূল মঞ্চের সামনে খামেনির কফিন রাখা হয়েছে, যার ওপর ঐতিহ্যবাহী কালো পাগড়ি শোভা পাচ্ছে।
একই সাথে রাখা হয়েছে হামলায় নিহত তার আরও চার পারিবারিক সদস্যের কফিন, যার মধ্যে তার মাত্র ১৪ মাস বয়সি নাতনি জাহরা মোহাম্মদী গোলপায়গানির ছোট কফিনটি বিশেষভাবে সবার দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। সমাবেশ থেকে সমবেত জনতা মুহুর্মুহু ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান দিয়ে চারপাশ প্রকম্পিত করে তুলছেন।
শোকানুষ্ঠানের এই বিশাল আয়োজনকে বর্তমান সরকারের প্রতি জনগণের সমর্থনের একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে গত জানুয়ারিতে দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া গণবিক্ষোভ এবং তা দমনে কঠোর ব্যবস্থার পর, এই জমায়েতকে সরকার পরিচালনার বৈধতা প্রমাণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
পাঁচ সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চললেও দুই পক্ষই যেকোনো মুহূর্তে পুনরায় যুদ্ধ শুরুর হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে। তবে মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে তেহরানের চিরচেনা যানজটপূর্ণ রাস্তাগুলো ছিল অনেকটাই ফাঁকা, এবং অনেক সাধারণ বাসিন্দা এই দীর্ঘ শোক চলাকালীন বিশৃঙ্খলা এড়াতে সাময়িকভাবে শহর ছেড়ে চলে গেছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে খামেনির উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে এখনও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ওই একই বিমান হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে শুক্রবার (৩ জুন) দেশটির শীর্ষ নেতারা বিদেশি প্রতিনিধিদের স্বাগত জানান এবং নিজেদের মধ্যে ইস্পাতকঠিন একতা প্রদর্শন করেন।
শান্তিকালীন আলোচনায় অংশ নেওয়া পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং নবনিযুক্ত রেভল্যুশনারি গার্ডসের প্রধান আহমদ ওয়াহিদি জনগণকে দলে দলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইরানের এই প্রতিশোধের কণ্ঠস্বর যেন গোটা বিশ্বের কানে পৌঁছায়।
কর্তৃপক্ষের ধারণা, কেবল রাজধানী তেহরানেই এক কোটিরও বেশি মানুষের সমাগম ঘটবে। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার পর এটিই ইরানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণজমায়েত হতে যাচ্ছে। কোনো ধরনের পদদলন বা দুর্ঘটনা এড়াতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সচেতনতামূলক নির্দেশনা প্রচার করা হচ্ছে।
সূচি অনুযায়ী, তেহরানে তিন দিন কফিন রাখার পর মঙ্গলবার তা ধর্মীয় নগরী কোমে, বুধবার প্রতিবেশী দেশ ইরাকে এবং সবশেষে আগামী বৃহস্পতিবার খামেনির নিজ শহর মাশহাদে সমাহিত করা হবে।
সূত্র: হুরিয়েত ডেইলি নিউজ
এমআই/টিকে