ভাইরাল ভিডিও নিয়ে মুখ খুললেন সেই শিক্ষিকা, করলেন হেনস্তার অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত
১০:৪৪ পিএম | ২৬ জুলাই, ২০২৬
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল স্কুল চলাকালীন নয়; বরং ছুটির পর সেই ভিডিওটি রেকর্ড করেন বলে জানিয়েছেন তিনি ও তার সহকর্মীরা।
বিউটি রাণীর অভিযোগ, ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ‘নেতিবাচক ক্যাপশনে’ তার ভিডিও ভাইরাল করেন আসিফ ইকবাল হিরণ নামের এক প্রবাসী তরুণ। ওই তরুণের বিরুদ্ধে তিনি সাইবার বুলিং এবং সামাজিকভাবে হেনস্তারও অভিযোগ তুলেছেন।
বিউটি রাণী পাল দেশের একটি গণমাধ্যম অনলাইনকে রোববার বিকেলে বলেন, ‘আমি আসলে রিল (গানসহ ছোট ভিডিও) বানাতে জানি না। আমার এক সহকর্মীকেই বলছিলাম যে কীভাবে রিল বানায়। স্কুল ছুটির পরে স্কুলের আঙিনাতেই আমি হেঁটে গেছি আর উনি ভিডিওটা করেছেন।’
সিলেটে বিউটি পালের পাশে শিক্ষক-লেখক ও সাংবাদিকরা
জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ আয়োজনে সিলেট জেলায় শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষিকা নির্বাচিত হন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন এই শিক্ষার্থী। তার ফেসবুক আইডিতে আটটি ভিডিও দেখা গেছে। কোনো ভিডিওতে শিশুদের তালে তালে তিনি সাপ্তাহিক দিনের নাম ইংরেজিতে শেখাচ্ছেন। কোনো ভিডিওতে ছন্দে ছন্দে অঙ্ক শেখাচ্ছেন।
‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ গানে হাজারো শিক্ষিকার প্রতিবাদী পোস্ট
প্রথম ভিডিওটি পোস্ট করেন চার বছর আগে। সেখানে তাকে ইংরেজিতে কথা বলতে শোনা যায়। সর্বশেষ ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, খেলার ছলে অঙ্ক শেখাচ্ছেন। এই আটটি ভিডিওর কোনোটিতেই কোনো গান নেই। গানযুক্ত ভাইরাল ভিডিওটি তিনি এরই মধ্যে ডিলিট করে দিয়েছেন।
যারা সমালোচনা করছেন, তাদের নিয়ে বিউটি রাণী বলেন, ‘আমরা মুখে দিয়ে বলব কারিকুলাম উন্নত, আর আমাদের মন মানসিকতা থাকবে সংকীর্ণ, তাহলে আমরা কীভাবে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিব? আমাদের মনমানসিকতা যদি এখন ডিজিটালাইজড না করি, স্মার্ট না হই, উন্নত না করি, তাহলে আমরা উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না। আমাদের সব দিক দিয়ে সমানতালে চলতে হবে।’
যেভাবে ভিডিওটি ভাইরাল হয়: শিক্ষিকার অভিযোগ অনুযায়ী, ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন নামের একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক (মূলত ব্যক্তিগত পেজ) আসিফ আহমদ ইকবাল হিরণ অনুমতি ছাড়াই তার ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে ভিডিওটি ডাউনলোড করে ভাইরাল করেন। শিক্ষিকা বলেন, ‘উনি আমার ভিডিওটা ডাউনলোড করে নিয়ে উনার পত্রিকায় নিউজ করেছেন এবং উনার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজেও আমার সম্পর্কে আজেবাজে লিখেছেন।’
শিক্ষিকার দাবি, আসিফ ইকবাল হিরণের পাঠানো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ না করার কারণে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে এই কাজ করেছেন। হিরণ তাকে ফোন করে ব্যক্তিগত প্রশ্ন (বাড়ি কোথায়, তিনি স্থানীয় কি না) করে হেনস্তা করার চেষ্টা করেন। শিক্ষিকা তাকে পোস্টটি ডিলিট করার অনুরোধ জানালেও তিনি তা করতে অস্বীকার করেন।
এই ঘটনার পর সারা দেশের শিক্ষক সমাজ, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এবং শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ওই শিক্ষিকার সমর্থনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার হয়েছেন। হাজারো শিক্ষিকা বিউটি রাণীর ব্যবহৃত গানটি দিয়েই ভিডিও তৈরি করে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
শিক্ষিকা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত, এভাবে সামাজিকভাবে হেনস্তা করা কাম্য নয়।’
তিনি শিক্ষক সুরক্ষা আইনের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘শিক্ষকদের সর্বোচ্চ মর্যাদা দিলে সমাজ সবচেয়ে বেশি নৈতিক হবে।’
অভিযুক্ত যুবকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বর্তমানে তিনি আইনি জটিলতায় না গিয়ে সারা দেশের মানুষের দেওয়া নৈতিক সমর্থনকেই তার শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি বলে মনে করছেন।
ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন পেজ ঘেঁটে দেখা যায়, দুদিন আগে বিউটি রাণীর আইডি থেকে ডাউনলোড করে এআই ভয়েসওভারে ভিডিওটি নিউজের মতো পোস্ট করা হয়। ভিডিওর শেষ দিকে বলা হচ্ছে, ফেঞ্চুগঞ্জের সচেতন মহল এবং শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল বলতে ঠিক কারা বা তাদের কোনো বক্তব্য ভিডিওতে নেই। এমনকি অভিভাবকদের ‘তীব্র প্রতিক্রিয়ারও’ কোনো বক্তব্য নেই।
আরেকটি টেক্সট নিউজে সাধারণ হেঁটে আসার দৃশ্যকে ‘অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
শিক্ষিকার অভিযোগের বিষয়ে আসিফ ইকবাল দেশের একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি ম্যাডামকে আদাব দিয়ে ভিডিওর বিষয়ে বক্তব্য জানতে চেয়েছি। আর কিছু বলিনি।’
সাধারণ একটা হেঁটে আসার দৃশ্যকে ‘অশ্লীল’ হিসেবে বর্ণনার কারণ জানত চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তো বলিনি। মানুষ বলেছে।’
ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন পেজটি কোনো অনলাইন গণমাধ্যম কি না, নিবন্ধন আছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, নিবন্ধন নাই।’
এসএন