চায়নাম্যান হয়ে জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন থেকে কিভাবে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী হয়ে উঠেন 'ডেভিড ইমন'
ছবি: সংগৃহীত
০৩:৫৪ পিএম | ৩০ জুলাই, ২০২৬
একসময় হাতে ছিল ক্রিকেট বল, স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর। চট্টগ্রামের ক্রিকেটাঙ্গনে সম্ভাবনাময় বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসেবে পরিচিত ছিলেন মোবারক হোসেন ইমন। তবে সময়ের ব্যবধানে সেই ক্রিকেটারই হয়ে ওঠেন চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘ডেভিড ইমন’। খুন, চাঁদাবাজি, অস্ত্রের মহড়া ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে আলোচনায় আসা এই ব্যক্তিকে অবশেষে যশোর থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকায় যৌথ অভিযানে তিন সহযোগীসহ ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), কোতোয়ালি মডেল থানা ও যশোর জেলা পুলিশের সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে দীর্ঘদিন নজরদারির পর তার অবস্থান শনাক্ত করে তাকে আটক করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠেন মোবারক হোসেন ইমন। লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্রিকেটের প্রতি ছিল প্রবল আগ্রহ। এলাকার মাঠে খেলা শুরু করে ২০১৯ সালের দিকে তিনি চট্টগ্রামের ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমিতে যোগ দেন। নিয়মিত অনুশীলন করতেন বাকলিয়া স্টেডিয়াম ও কাজীর দেউড়ি এলাকায়। বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসেবে দ্রুত পরিচিতি পান এবং ভারতীয় স্পিনার কুলদীপ যাদবের বোলিং অনুসরণ করতেন। ক্রিকেট নিয়েই ছিল তার ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমির কোচ আমিনুল হক বলেন, ইমন খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল। নিয়মিত অনুশীলন করত। করোনার পর থেকে আর তাকে দেখা যায়নি। পরে গণমাধ্যমে ‘ডেভিড ইমন’ নামে তার বিষয়ে জানতে পারি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর ইমন অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে নতুন করে আলোচনায় আসেন তিনি। ওই সময় থেকেই বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’এর গ্রুপের সক্রিয় সদস্য হিসেবে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।
পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, সাহসী ও বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের কারণে অল্প সময়েই তিনি সাজ্জাদ গ্রুপের অন্যতম সক্রিয় সদস্যে পরিণত হন। বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, চান্দগাঁওসহ চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় এবং রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতে এই গ্রুপের কার্যক্রমে তার সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ ছিলেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ। তাদের দাবি, ডেভিড ইমনের ১৫ থেকে ২০টি অস্ত্র বহনের ছবিও সংগ্রহে রয়েছে।
পুলিশের তথ্যমতে, বড় সাজ্জাদের সহযোগী ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন কারাগারে যাওয়ার পর ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান আলম মাঠপর্যায়ে গ্রুপটির কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেন।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট চট্টগ্রামে আনিস ও মোহাম্মদ হাসান হত্যা মামলায় প্রথমবারের মতো ডেভিড ইমনের নাম আসে।এরপর ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার আলোচিত জোড়া হত্যা মামলায়ও তাকে আসামি করা হয়। একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাতেও তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সর্বশেষ নগরের চন্দনপুরা এলাকায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায়ও তিনি আলোচনায় আসেন।
পুলিশ জানিয়েছে, ডেভিড ইমন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে অপরাধচক্রের আরও তথ্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
এমআর/টিএ