প্রেম নাকি দেখেশোনে বিয়ে—সুখে আছেন কারা? গবেষণার তথ্য প্রকাশ
ছবি: সংগৃহীত
১২:৪৮ পিএম | ২৬ আগস্ট, ২০২৬
প্রেমের বিয়ে নাকি পারিবারিক দেখেশোনে বিয়ে—কোন দম্পতিরা বেশি সুখে আছেন? আর সুখের চাবিকাঠিই বা কী? অর্থকড়ি, বিশাল দালানকোঠা নাকি স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা? সম্প্রতি পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে দেশব্যাপী গবেষণায় উঠে এসেছে এক এমন তথ্য।

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি চারজন দম্পতির তিনজনই অর্থাৎ ৭৫ দশমিক ৫ ভাগ পারিবারিকভাবে দেখেশোনে বিয়ে করেছেন। অন্যদিকে প্রেমের বিয়ে করেছেন ২৪ দশমিক ৫ ভাগ শতাংশ দম্পতি।
তবে বিয়ের ধরণ যা-ই হোক না কেন, দেশের পারিবারিক সম্পর্কের চিত্রটি বেশ উদ্বেগজনক। গবেষণার তথ্য বলছে, দেশের ৫০ দশমিক ১ শতাংশ দম্পতির পরিবারেই অটুট বন্ধন নেই—অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক পরিবারেই পারস্পরিক সংহতি বা বন্ধন 'দুর্বল'।

দেশে দিন দিন বিবাহবিচ্ছেদ বৃদ্ধি পাওয়া এবং পারিবারিক বন্ধন ঢিলে হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে নিপসমের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ এই জরিপ পরিচালনা করে। দেশের আটটি বিভাগের ১৬টি জেলার শহর ও গ্রামের ১,৬৪০ জন বিবাহিত নারী-পুরুষের ওপর ছয় মাস ধরে এই গবেষণা চালানো হয়।
সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহরিয়া সাত্তারের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় সহ-গবেষক হিসেবে ছিলেন ডা. মো. আশরাফুল আলম, ডা. এস এম শরফ-উল-আলম ও ডা. শুভ্রতিথি গোস্বামী। জরিপ এগুলো যে ১৬টি জেলায় চালানো হয় সেগুলো হল
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, মৌলভীবাজার, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, খুলনা, যশোর, বরিশাল, পটুয়াখালী, রংপুর, নীলফামারী, ময়মনসিংহ ও শেরপুর। ১৬টি জেলা থেকে মোট ৪৮টি উপজেলা বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রতি জেলায় ৩টি করে উপজেলায় চলে এই জরিপ। ৪৮টি উপজেলা থেকে ৯৬টি ইউনিয়ন এবং সেখান থেকে ১৯২টি ওয়ার্ড নির্বাচিত করা হয়েছিল জরিপের জন্য।
পাকা দালানের চেয়ে 'কাঁচা ঘরে' ভালোবাসা বেশি!
গবেষণায় আরও একটি অবিশ্বাস্য ও চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সাধারণত আমরা মনে করি উন্নত জীবনযাত্রা বা ভালো বাড়িঘরই সুখের মূল চাবিকাঠি। কিন্তু তথ্যে দেখা গেছে, পাকা দালানের তুলনায় কাঁচা ঘরে বসবাসকারী পরিবারগুলোতে পারস্পরিক বন্ধন মজবুত হওয়ার সম্ভাবনা ১.৬৩ গুণ বেশি!
গবেষকরা বলছেন, কাঁচা ঘরের খোলামেলা পরিবেশ, সেখানে প্রতিদিনের ঘনিষ্ঠ ভাববিনিময় এবং প্রতিবেশী ও স্বজনদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ বেশি থাকে। অন্যদিকে দালান যত উঁচু হচ্ছে, মানুষের মধ্যকার মানসিক দূরত্বও যেন তত বাড়ছে।
টাকা-পয়সা বা গাড়ি-বাড়ি নয়, সুখী পরিবারের মূল ভিত্তি হলো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। নিপসমের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দম্পতির মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া, মতামত দেওয়া এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধায় সমতা বা সামঞ্জস্য রয়েছে, তাঁদের পরিবারে অটুট বন্ধন গড়ে ওঠার সম্ভাবনা অন্যদের তুলনায় প্রায় ৬২ গুণ বেশি!
অথচ দেশে মাত্র ২৪.৮% দম্পতি পারস্পরিক সুষম ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারছেন। বাকি অর্ধেকেরও বেশি (৫০.৪%) দম্পতির সম্পর্ক ওঠানামার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বন্ধন দৃঢ় করার অন্যান্য রসায়ন
গবেষণায় পরিবারকে সুসংগঠিত রাখার আরও কিছু প্রধান বিষয় ফুটে উঠেছে:
• নিজের আয় থাকলে সম্পর্ক মজবুত: সঙ্গীর পাশাপাশি নিজের ব্যক্তিগত আয় থাকলে পরিবারে বন্ধন মজবুত হওয়ার সম্ভাবনা ১.৬৫ গুণ বাড়ে। গ্রামে এই প্রভাব আরও বেশি (২.১৯ গুণ)।
• শহরের অবস্থা কিছুটা ভালো: গ্রামে বসবাসের চেয়ে শহরের অধিবাসীদের পারিবারিক সংহতি তুলনামূলক ১.৩৯ গুণ ভালো।
• পারিবারিক নির্যাতন প্রধান শত্রু: পরিবারে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন দম্পতিদের মধ্যে বিশ্বাস, যোগাযোগ ও আবেগ ভেঙে দেয়, যা সম্পর্কের স্থায়িত্ব কমায়।
গবেষকদের পাঁচ পরামর্শ
ক্রমবর্ধমান বিচ্ছেদ ঠেকাতে ও সুখী পরিবার গড়তে গবেষকরা ৫টি জরুরি সুপারিশ করেছেন:
1. স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে দম্পতিদের জন্য কাউন্সেলিং ও সম্পর্কের শিক্ষার ব্যবস্থা করা।
2. বিশেষ করে গ্রামে নারীদের আয়বর্ধক কাজের সুযোগ তৈরি করা।
3. গ্রাম ও শহরের সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য দূর করা।
4. আবাসন পরিকল্পনায় প্রতিবেশী ও স্বজনদের সঙ্গে মেলামেশার পরিবেশ রাখা।
5. পারিবারিক নির্যাতন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ ও সহায়তা সেবা জোরদার করা।
গবেষকদের মতে, সুস্থ ও সংহত বাংলাদেশ গড়তে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সমতা, শ্রদ্ধা ও খোলামেলা যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই - বলছেন গবেষকরা।
টিএ/