© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

রদবদলে ‘নির্দোষদের’ কোপ, বিতর্কিতরা বহাল: সামনে কি আরও বড় চমক?

শেয়ার করুন:
রদবদলে ‘নির্দোষদের’ কোপ, বিতর্কিতরা বহাল: সামনে কি আরও বড় চমক?

ছবি: সংগৃহীত

গোলাম ইউসুফ, স্পেশাল করসপন্ডেন্ট
০২:০৪ পিএম | ২২ আগস্ট, ২০২৬
ছয় মাসের মাথায় এসে বিতর্কিত ও অদক্ষ মন্ত্রীদের সরিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে ঘটেছে ভিন্ন চিত্র। যেসব মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে জনরোষ বা বড় ধরনের পারফরম্যান্স ঘাটতি ছিল না, সেগুলোতে পরিবর্তন আনা হলেও বহাল তবিয়তে রয়ে গেছেন বিতর্কের শীর্ষে থাকা মন্ত্রীরা। সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে জোর আলোচনা রয়েছে—এই পরিবর্তন কেবল একটি অন্তর্বর্তীকালীন পদক্ষেপ, সামনে আরও বড় ধরনের পুনর্বণ্টন ও রদবদল আসছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মন্ত্রিসভায় যে রদবদল আনা হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নেটিজেনরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে এসেছে। এমনকি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিংকনকে করার প্রতিবাদ এরই মধ্যে এসেছে। লিংকনকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়ায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব ও ঢাকা মহানগরীর সভাপতি এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব। বিবৃতিতে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, ‘বিতর্কিত কায়সার লিংকনকে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত করে বর্তমান সরকার দেশের মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে গভীর আঘাত হেনেছে।’

এদিকে নতুন করে পাঁচজন সদস্য মন্ত্রিসভায় যুক্ত হলেন। আর একজন প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণ মন্ত্রী হয়েছেন। সব মিলিয়ে চারজন নতুন মন্ত্রী এবং দুজন প্রতিমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যের দপ্তর বণ্টন ও পুনর্বণ্টন করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। ফলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার আকার দাঁড়াল ৫১ জনে। প্রধানমন্ত্রী ছাড়া পূর্ণ মন্ত্রী ২৬ জন এবং প্রতিমন্ত্রী ২৪ জন। আগে মন্ত্রিসভা ছিল ৪৮ সদস্যের—প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ২৪ মন্ত্রী এবং ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন রাষ্ট্রপতি। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনকে সরিয়ে উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে দায়িত্ব পেয়েছেন ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। এছাড়া বিমান মন্ত্রী আফরোজা রিতাকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে বদলি করে তাঁর প্রতিমন্ত্রী মিল্লাতকে পূর্ণ মন্ত্রী করা হয়েছে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই পরিবর্তনকে ‘অপ্রত্যাশিত’ ও ‘চমকপ্রদ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নেটিজেনদের মতে, তুলনামূলক কম আলোচিত বা বিতর্কমুক্ত ব্যক্তিদের সরানো হলেও ছয় মাসের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে যাদের বাদ পড়ার কথা ছিল, তারা বহাল আছেন। অনেকেই ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখছেন, "ছয় মাসের রদবদলে অনেকের মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া হলো নিরীহ জায়গায়"।

বহাল তবিয়তে বিতর্কিতরা

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়: শিশু মৃত্যুর ঘটনায় পরিচালকের ফাঁসি চাওয়া, রাজধানীর জনপ্রিয় একটি হাসপাতাল বন্ধ, ফুল হাতা শার্টের প্রেসক্রিপশন কিংবা হাসপাতালে গিয়ে তরকারি চেখে দেখার মতো কাণ্ডে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন তীব্র সমালোচিত হন। চিকিৎসকদের অসন্তোষ ও টেন্ডার জটিলতার পরও তাঁর অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। 

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়: চাঁদাবাজিকে ‘সমঝোতা’ আখ্যা দিয়ে শুরুতেই বিতর্কের মুখে পড়েন শেখ রবিউল আলম। পরিবহন নৈরাজ্য বন্ধ না হলেও তাঁর ওপর কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত আসেনি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার কারণে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ সমালোচিত। গুঞ্জন রয়েছে তাকে স্থানীয় সরকারে পাঠিয়ে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এনিকে স্বরাষ্ট্রের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে, তবে তা বাস্তবায়নে বিলম্ব তৈরি করেছে প্রশ্ন।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়: পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লোডশেডিং এবং "সময় গোনা ছাড়া কিছু করার নেই"—এমন বক্তব্যে সমালোচিত বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও বহাল রয়েছেন। 

স্থানীয় সরকার ও পানি সম্পদ: দুই ছেলের নামে ইউপি নামকরণ ও প্রকল্প পাইয়ে দিয়ে ‘মিরাকেল’ দাবি করা মীর শাহে আলম এবং সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল ভিডিও জটিলতায় থাকা প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদকে নিয়েও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সামনে আরও বড় রদবদলের ইঙ্গিত

সরকারের ছয় মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রীর পূর্বঘোষিত পারফরম্যান্স মূল্যায়নের কাজটি এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। প্রশাসনিক সূত্র ও রাজনৈতিক মহলের ভাষ্যমতে, বর্তমান পরিবর্তনটি রাজনৈতিক ভারসাম্যের অংশ। সরকারের ভাবমূর্তি পুনর্গঠন ও মাঠপর্যায়ের জনরোষ প্রশমিত করতে স্বাস্থ্য, সড়ক, বিদ্যুৎ এবং স্বরাষ্ট্রসহ বিতর্কিত দপ্তরগুলোতে শিগগিরই চূড়ান্ত পুনর্বণ্টন আসতে পারে। বিষয়টি পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রী টেবিলে। আপাতত যে পরিবর্তন হয়েছে সেটা ছয় মাসের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের পরিবর্তন নয়! এই আপদকালীন পরিবর্তনের পর চূড়ান্তভাবে একটি পরিবর্তন আসতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক হেলাল উদ্দিন সরকারের এই পরিবর্তনকে জোট সরকারের রাজনৈতিক ভারসাম্যের অংশ হতে পারে মনে করেন। অন্যদিকে সাংবাদিক এবং অন্তর্বর্তী সরকারের গণমাধ্যম সম্পর্কিত সংস্কার কমিটির সদস্য জিমি আমির বলেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে যেসব বিতর্কিত মন্ত্রীর পদ হারানোর কথা ছিল, তাদের না সরিয়ে এমন পরিবর্তনকে তিনি জনআকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী এবং পুরনো 'ফ্যাসিস্ট সিস্টেমের' পুনরাবৃত্তি।

তিনি প্রশ্ন তোলে বলেন, তথ্য মন্ত্রণালয় বারবার পরিবর্তনের মুখে পড়ায় এটি কোনো 'অভিশপ্ত মন্ত্রণালয়' কি না কিংবা এখানকার আমলা ও বাইরের মিডিয়া মালিকদের কোনো অদৃশ্য প্রভাব বা কলকাঠি নাড়ার বিষয় রয়েছে কি না, সে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি এও সন্দেহ প্রকাশ করে বলছেন, একের পর এক মন্ত্রী সরানোর পেছনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি গভীরভাবে জেনে-বুঝে করছেন, নাকি কারো প্ররোচনা বা কথায় প্রভাবিত হয়ে করছেন।

এসএন

মন্তব্য করুন