চক্ষুসেবা সম্প্রসারণে অপটোমেট্রি কাউন্সিল গঠনে ঐকমত্য
ছবি: সংগৃহীত
১১:০৫ পিএম | ২৬ আগস্ট, ২০২৬
সারাদেশে চক্ষুসেবা সম্প্রসারণে এবং অপটোমেট্রিস্টদের সেবাকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার জন্য একটি অপটোমেট্রি কাউন্সিল গঠনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়েছেন চক্ষুস্বাস্থ্য খাতের অংশীজনেরা।
মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আয়োজিত চক্ষুস্বাস্থ্য বিষয়ক এক জাতীয় সংলাপে এ ঐক্যমত হয়।
সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা অপটোমেট্রিস্ট ও অন্যান্য চক্ষুসেবা কর্মীদের মূলধারায় আনার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে তারা এসব কর্মীর কর্মপরিধি, বিশেষ করে ওষুধের ব্যবস্থাপত্র দেওয়ার বিষয়ে তাদের জন্য সীমানা নির্ধারণের ওপর জোর দেন।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. এএসএমএম কাদির বলেন, “অপটোমেট্রি শিক্ষায় প্রবেশের প্রাকযোগ্যতা কী হবে, অপটোমেট্রিস্টরা ওষুধের ব্যবস্থাপত্র লিখবেন কি না, কিংবা তারা স্বাধীনভাবে প্র্যাকটিস করবেন নাকি একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের অধীনে কাজ করবেন—এসব নির্ধারণ করার জন্য একটি সংস্থা থাকা উচিত।”
তার সঙ্গে একমত পোষণ করে বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির মহাসচিব অধ্যাপক মো. জিন্নু রাইন বলেন, প্রাথমিক চক্ষু চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে ওষুধ লেখার ক্ষেত্রে অপটোমেট্রিস্টদের একটি সীমানা থাকা উচিত।
তিনি বলেন, “একজন অপটোমেট্রিস্টকে কখনোই স্টেরয়েডের মতো ওষুধ লেখার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।”
বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির সভাপতি ডা. মো. তৌহিদুর রহমান চক্ষুসেবা কর্মীদের বিভিন্ন স্তরের কোর্সে অভিন্নতা আনার এবং তাদের জন্য সীমানা নির্ধারণের পরামর্শ দেন।
তিনি বলেন, “চক্ষুসেবার সকল উপাদানকে একত্রিত করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। এবং এখানে সরকারের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে।”

বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির কোষাধ্যক্ষ ডা. সৈয়দ মেহবুব উল কাদির বলেন, সরকারের উচিত অপটোমেট্রিস্টদের মূলধারায় আনার উদ্যোগ নেওয়া। কারণ তাদের জন্য এখনও সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো স্থান নেই, যদিও ভারতে এই পেশাজীবীরা চক্ষুসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তবে অপটোমেট্রিস্টরা যাতে তাদের নির্ধারিত কর্মপরিধির মধ্যে থাকেন, তা নিশ্চিত করার জন্য একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।
অরবিস ইন্টারন্যাশনাল “চক্ষুস্বাস্থ্য বিষয়ক জাতীয় নীতি সংলাপ: বাংলাদেশে অপটোমেট্রিস্ট এবং সহযোগী চক্ষুসেবা কর্মীদের জন্য কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা বিষয়ে পরামর্শসভা” শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অরবিস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এবং ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর দ্য প্রিভেনশন অব ব্লাইন্ডনেসের বাংলাদেশের অনারারি কান্ট্রি চেয়ার ডা. মুনির আহমেদ সংলাপ পরিচালনা করেন। অপটোমেট্রিস্টদের মূলধারায় আনার প্রয়োজনীয়তার প্রতি আলোকপাত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ চক্ষুসেবা প্রদানে অনেক পিছিয়ে রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে জনবলের অভাব অন্যতম প্রধান কারণ।
ডা. মুনির বলেন, বাংলাদেশে সম্প্রতি সূচিত হওয়া “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পেকস ২০৩০” অর্জন করা প্রয়োজনীয় জনবল ছাড়া কঠিন হবে।
ডা. কে জামান বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক শরীফুজ্জামান পরাগ বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ২০ শতাংশ জনসংখ্যা এখন চক্ষুসেবা চায়, তবে সে চাহিদা পূরণের জন্য স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান ও জনবল পর্যাপ্ত নয়।
চিটাগাং আই ইনফার্মারি অ্যান্ড ট্রেনিং কমপ্লেক্সের মেডিকেল পরিচালক ডা. রাজীব হোসেন বলেন, বাংলাদেশের প্রাথমিক চক্ষু চিকিৎসা দেওয়ার জন্য একটি নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি সারা বাংলাদেশে গ্রাজুয়েট ২৫০ জন অপটোমেট্রিস্ট রয়েছেন। তাদের জন্য একটি স্বতন্ত্র কাউন্সিল প্রয়োজন এবং সরকারি স্বীকৃতিও প্রয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই অপটোমেট্রি পেশার জন্য সরকারি কাউন্সিল রয়েছে এবং পেশাটিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তারা স্বতন্ত্রভাবে কাজ করছেন। আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী তাদের কার্যপরিধি নির্ধারণ করা উচিত।
সিএসএফ গ্লোবালের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার জহুরুল ইসলাম জুয়েল বলেন, চক্ষুসেবা সম্প্রসারণে অপটোমেট্রিস্টদের স্বীকৃতি দেওয়া অপরিহার্য। তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি অপটোমেট্রি কাউন্সিল গঠনের পরামর্শ দেন।
অপটোমেট্রি কনফেডারেশন অব বাংলাদেশ, ওসিবি'র সভাপতি শাহাদাত হোসেন দেলোয়ার বলেন, বিশ্ব অপটোমেট্রি কাউন্সিলের তথ্য মতে, বিশ্বের ১২৫টি দেশে অপটোমেট্রিস্ট রয়েছে এবং ৩৪টি দেশে প্রতিষ্ঠিত কাউন্সিল রয়েছে। পাশাপাশি অপটোমেট্রি পেশাজীবীদের সরকারি স্বীকৃতি রয়েছে এবং প্রাথমিক চক্ষু চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের আন্তর্জাতিক গাইডলাইন ও কার্যপরিধি রয়েছে। বিশ্ব অপটোমেট্রি কাউন্সিল, আন্তর্জাতিক মানসম্মত পেশাগত শ্রেণিবিন্যাস, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুযায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে অপটোমেট্রি কাউন্সিল গঠন করা হলে অপটোমেট্রি শিক্ষার মান, পেশাগত নিবন্ধন, লাইসেন্সিং ও সেবার মান নিয়ন্ত্রণে একটি সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি হবে।
পাশাপাশি অনুমোদিত পদবি ব্যবহার ও বিভ্রান্তিকর পেশাগত পরিচয় প্রদান বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে এবং মাঠপর্যায়ে অনৈতিক ও অননুমোদিত কার্যক্রম কমাতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির সহ-সভাপতি অধ্যাপক মো. সায়েদুল হক, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. শাহ আলম, চট্টগ্রাম ইনস্টিটিউট অব কমিউনিটি অপথালমোলজির পরিচালক প্রফেসর ডা, মনিরুজ্জামান ওসমানী, বাংলাদেশ অপটোমেট্রিক সোসাইটির সভাপতি মো. দিদারুল ইসলাম, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর মোহাম্মদ সালাউদ্দিন (সুমন), ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়ার স্কুল অব পাবলিক হেলথ অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেসের ডিন ডা. আনিসুর রহমান, দীপ আই কেয়ার ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. খায়রুল ইসলাম, ঢাকা অপটিক্যাল প্যাভিলিয়নের প্রতিষ্ঠাতা ড. গাজী রিয়াজ রহমান এবং বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতি (বিজেএকেএস) কুমিল্লার সাধারণ সম্পাদক এ কে এম আবদুস সেলিম প্রমুখ সংলাপে বক্তব্য রাখেন।
এমআই/টিএ