‘সুন্নি ন্যাটো’ থেকে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা: ভারতের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ ও বাংলাদেশের করণীয়
ছবি: সংগৃহীত
০৪:৪৫ পিএম | ২৭ আগস্ট, ২০২৬
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি (তুরস্ক-পাকিস্তান-সৌদি আরব) একটি ‘সুন্নি ন্যাটো’ তৈরি করেছে—যেখানে সৌদির অর্থ, তুর্কি ড্রোন ও পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিচ্ছে। ভারত তার মার্কিন-ইসরায়েলপন্থী নীতির কারণে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক (চাবাহার বন্দর, জ্বালানি) হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে। ইসরায়েল ইরানকে অস্তিত্বগত হুমকি মনে করলেও দূরত্ব ও ভিন্ন ভিন্ন আদর্শিক প্রেক্ষাপটের কারণে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রকে ততটা গুরুত্ব দেয় না। বাংলাদেশের জন্য এই অস্থির পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো ‘হেজিং’—সব শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। দক্ষিণ এশিয়া, উপসাগর ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক সেতু হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পারলেই বাংলাদেশ আঞ্চলিক ঝুঁকিকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারবে।
সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ (‘সুন্নি ন্যাটো’)
‘তুরস্ক-পাকিস্তান-সৌদি আরব’-এর সমন্বয়ে গঠিত ‘সুন্নি ন্যাটো’-এর ধারণা এখন আর তত্ত্ব নয়—এটি বাস্তবে রূপ নিয়েছে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’-এর মাধ্যমে। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে ন্যাটোর ধারা-৫-এর মতো একটি সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—‘তিনটি দেশের যেকোনোটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা সব দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে’।
এই উন্নয়ন মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার সমীকরণকে গভীরভাবে বদলে দিয়েছে। এটি ভারত ও ইসরায়েলের জন্য যেমন বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, তেমনি বাংলাদেশের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও সুযোগ-সংকটের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে।
নতুন কৌশলগত বাস্তবতা: ‘সুন্নি ন্যাটো’-এর শক্তির তিনটি স্তম্ভ
মক্কা চুক্তি তিনটি ভিন্ন কিন্তু পরিপূরক শক্তিকে একত্রিত করেছে:
১. সৌদি আরব: অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ইঞ্জিন
· ইসলামের দুই পবিত্র মসজিদের রক্ষক এবং বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে সৌদি আরব এই জোটের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড।
· সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করছে। বর্তমানে প্রায় ৮,০০০ পাকিস্তানি সেনা, যুদ্ধবিমান (জেএফ-১৭), ড্রোন স্কোয়াড্রন ও বিমান-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সৌদি আরবে মোতায়েন রয়েছে।
· পাকিস্তানের অর্থনীতিতে সৌদি বিনিয়োগ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে এর ভূমিকা এই জোটকে বিশেষ প্রভাবশালী করেছে।
২. তুরস্ক: সামরিক-প্রযুক্তিগত হাব
· ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী ও দ্রুত উন্নয়নশীল প্রতিরক্ষা শিল্প—বিশেষ করে মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ড্রোন)-এ তুরস্কের সক্ষমতা অসাধারণ।
· তুর্কি ড্রোন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বায়কার পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। ২০২৬ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের (অপারেশন সিন্ধুর) সময় তুরস্ক পাকিস্তানকে প্রায় ১,০০০ সামরিক ড্রোন ও তার অপারেটর সরবরাহ করেছিল, যা এই জোটের সামরিক সম্পর্কের গভীরতার অন্যতম প্রমাণ।
· তুরস্ক পাকিস্তানে একটি কমব্যাট ড্রোন অ্যাসেম্বলি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের ইঙ্গিত দেয়।
৩. পাকিস্তান: পারমাণবিক শক্তি
· একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর মুসলিম দেশ হিসেবে পাকিস্তান এই জোটকে একটি অনন্য কৌশলগত স্তর প্রদান করে।
· পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার মূলত ভারতের মুখোমুখি হলেও, সৌদি আরব ও তুরস্কের প্রতি আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি মানে—এই দেশগুলোর ওপর বড় আক্রমণ করতে চাইলে এখন প্রতিপক্ষকে পাকিস্তানের পারমাণবিক উত্তরণের ঝুঁকি মাথায় রাখতে হবে।
· পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সৌদি আরবের সঙ্গে এই প্রতিরক্ষা চুক্তি কিংডমকে পাকিস্তানের পারমাণবিক ছত্রছায়ায় নিয়ে আসতে পারে।
সাম্প্রদায়িক ফাটল ও কৌশলগত সীমাবদ্ধতা
‘সুন্নি ন্যাটো’ বলে পরিচিত এই জোটের সাম্প্রদায়িক মাত্রা ও কার্যকরী সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
· এই চুক্তি সুস্পষ্টভাবে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলার জন্য তৈরি, বিশেষ করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পরিপ্রেক্ষিতে।
· তবে জোটের কার্যকারিতা সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ গতিশীলতার কারণে সীমিত। পাকিস্তানের ১৫-২০% শিয়া জনগোষ্ঠী রয়েছে এবং তালেবান ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের সঙ্গে তার সংঘাত চলছে। তাই পাকিস্তান ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযানে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। তার ভূমিকা বেশি হবে কৌশলগত সহায়তা—বিমান-প্রতিরক্ষা, প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিকস।
· চুক্তিতে প্রতিটি সদস্যের সঠিক সামরিক দায়িত্ব উল্লেখ নেই, যা এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একজন প্রাক্তন ইরানি রাজনীতিবিদ এটিকে ‘কাগজের চুক্তি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ভারতের কৌশলগত দ্বিধা: মক্কা চুক্তি গঠনের সময় ভারতের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ইতিমধ্যেই চরম চাপে রয়েছে, মূলত ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার দৃশ্যমান সম্পৃক্ততার কারণে। ইরান ও ইসরায়েল দন্দ্বের কারনে ভারত-ইরান সম্পর্ক সংকটের মুখে। ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক তার মধ্যপ্রাচ্য নীতির ভিত্তি ছিল, যা জ্বালানি নিরাপত্তা, চাবাহার বন্দরের মাধ্যমে মধ্য এশিয়ায় সংযোগ এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কৌশলগত ভারসাম্য এনে দিয়েছিল। কিন্তু এই সম্পর্ক এখন নাজুক অবস্থায়:
· তেল আমদানি বন্ধ: ভারত ইরান থেকে প্রচুর পরিমাণে অপরিশোধিত তেল আমদানি করত (মোট আমদানির ১১.৫%), কিন্তু ২০১৯ সালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনঃস্থাপনের পর তা বন্ধ করে দেয়। সম্প্রতি তেল ও গ্যাস সহযোগিতা পুনরুজ্জীবিত করতে আলোচনা হলেও ভূরাজনৈতিক পরিবেশ প্রতিকূল।
· চাবাহার বন্দর ঝুঁকিতে: ভারত চাবাহারে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে, পাকিস্তানকে বাইপাস করে চীনের গওয়াদর বন্দরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে। কিন্তু মার্কিন চাপ, নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর অনীহা এবং ইরানের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা চাবাহার প্রকল্পকে পাশে সরিয়ে দিয়েছে। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ইরান ভারতকে শত্রুপক্ষের মিত্র হিসেবে দেখতে পারে এবং চাবাহার ‘অস্থিতিশীলতার জিম্মি’ হয়ে পড়তে পারে।
· কূটনৈতিক ভুল মূল্যায়ন: ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রধানমন্ত্রী মোদির ইসরায়েল সফর এবং হামলার পর ভারতের নীরবতা তেহরানে স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে গণ্য হয়েছে যে ভারত পক্ষ বেছে নিয়েছে। এতে ভারতের দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ ও ‘নিরপেক্ষতা’ ভাঙার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েল-পাকিস্তান পারমাণবিক অসমতা: একটি যৌক্তিক প্রশ্ন উঠেছে, ইসরায়েল কেন পাকিস্তানের ১৮০টি পারমাণবিক অস্ত্রকে ‘সমস্যা’ মনে করে না, অথবা ইরানের পারমাণবিক সম্ভাবনাকে ‘মারাত্মক হুমকি’ হিসেবে দেখে?
· পাকিস্তান-ইসরায়েল গতিশীলতা: পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার মূলত ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক। পাকিস্তানের সঙ্গে ইসরায়েলের সরাসরি কোনো দ্বন্দ্ব নেই, তাই এই অস্ত্র ইসরায়েল বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য নয়।
· ইরানের বিপ্লবী আদর্শ প্রসঙ্গ: ইরানের নেতৃত্ব ধারাবাহিকভাবে ইসরায়েলবিরোধী ও পশ্চিমাবিরোধী আদর্শ পোষণ করে। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের সম্ভাবনাকে ইসরায়েল প্রত্যক্ষ অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখে, যা ব্যালিস্টিক মিসাইল ও হিজবুল্লাহ-হামাসের মতো প্রক্সি মাধ্যমে অপ্রতিসম উত্তরণ ঘটাতে পারে।
· ৩,৫০০ কিলোমিটারের বাস্তবতা: পাকিস্তানের পারমাণবিক-সক্ষম মিসাইল প্রধানত স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার, যা ভারতকে লক্ষ্য করে তৈরি। ইসরায়েল পাকিস্তান থেকে প্রায় ৩,৫০০ কিলোমিটার দূরে—এই ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ইসরায়েলের তাৎক্ষণিক হুমকি ধারণাকে কমায়।
· ‘ইসলামিক বোম্ব’ উদ্বেগ: তবে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ রয়েছে যে, পাকিস্তান সৌদি আরবের মতো ধনী ইসলামিক দেশগুলোকে পারমাণবিক প্রযুক্তি সরবরাহ করতে পারে, যা ‘ইসলামিক বোম্ব’ তৈরি করবে এবং আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্য সম্পূর্ণ বদলে দেবে। এই আশঙ্কা পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ভারতের প্রতিক্রিয়া
বর্তমান ধারায় ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, ইরানকে ঝুঁকিতে ফেলে। এটি অত্যন্ত উচ্চ-ঝুঁকির জুয়া। ইরানকে ক্ষুব্ধ করে চাবাহার প্রকল্প ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) ভারতীয় প্রবাসী সামাজিক উত্তেজনা বা কঠোর ভিসা নীতির শিকার হতে পারেন, যা ভারতের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশের ভূমিকা ও কৌশলগত বিশ্লেষণ
এই পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান স্বতন্ত্র। এটি মক্কা চুক্তি বা ভারত-ইরান-ইসরায়েল ত্রিভুজের সরাসরি অংশ নয়, তবে এর প্রভাব গভীরভাবে অনুভব করবে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে কি কি সুযোগ তৈরি হতে পারে—
· রেমিট্যান্স ও জ্বালানি: বাংলাদেশের অর্থনীতি রেমিট্যান্সের (৫০%-এর বেশি উপসাগরীয় দেশ থেকে) ও জ্বালানি আমদানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। আঞ্চলিক অস্থিরতা প্রত্যক্ষভাবে এর অর্থনৈতিক লাইফলাইনকে প্রভাবিত করে। তাই বাংলাদেশের প্রধান স্বার্থ হলো উত্তেজনা নিরসন, কোনো পক্ষে না নেওয়া।
· অংশীদারিত্বের বহুমুখীকরণ: বাংলাদেশ সব পক্ষের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য, নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পারে। সৌদি আরবের (সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স উৎস), তুরস্কের (ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য অংশীদার) এবং ইরানের (সস্তা জ্বালানির সম্ভাব্য উৎস) সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গভীর করতে পারে। এই বহু-মিত্রতা নীতি অর্থনৈতিক সুবিধা বাড়াবে এবং আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়াবে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক জটিল—গভীর অর্থনৈতিক নির্ভরতা রয়েছে, আবার ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতাও বিদ্যমান। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় বাংলাদেশ একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য নীতি অনুসরণ করতে পারে।
· ভারত-পাকিস্তান প্রতিদ্বন্দ্বিতা এড়ানো: বাংলাদেশকে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের পেয়াদা হিসেবে দেখা এড়াতে হবে। তার কৌশলগত স্বার্থ কোনো পক্ষে না নেওয়ার মধ্যে নিহিত। বরং বাংলাদেশ নিজেকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগর ও হিমালয় অঞ্চলের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।
· দ্বিপাক্ষিক সমস্যা সমাধান: পানি বণ্টন ও সীমান্ত নির্ধারণের মতো ইস্যুগুলো দ্বিপাক্ষিক সংলাপের মাধ্যমে সমাধানে গুরুত্ব দিতে হবে, যা ভারতের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতিশ্রুতি দেখাবে এবং নিজের স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ণ রাখবে।
বাংলাদেশ ‘হেজিং’ (একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে নির্ভরশীলতা কমানো) কৌশল গ্রহণ করতে পারে:
· মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক: বাংলাদেশের জন্য মার্কিন বাজার ও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তা, সুশাসন ও বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে পারে, কিন্তু স্পষ্ট করে দিতে পারে যে চীন বা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক প্রক্সি হিসেবে ব্যবহৃত হবে না।
· চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই): চীন বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। বিআরআই থেকে চলমান সুবিধা নেয়ার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
· সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক: বাংলাদেশ তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে পারে—একটি সাম্প্রদায়িক জোটের অংশ হিসেবে নয়, বরং মুসলিম-প্রধান দেশ হিসেবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে। এটি কোনো ‘শূন্য-সমষ্টি’ খেলা নয়; ভারত ও চীনের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্কের পাশাপাশি তা চলতে পারে।
বঙ্গোপসাগর ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক নিরাপত্তা অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। তাই বাংলাদেশকে:
· নৌ-সক্ষমতা বাড়াতে হবে: নিজের সামুদ্রিক সম্পদ ও বাণিজ্য পথ রক্ষায় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
· সহযোগিতামূলক নিরাপত্তায় অংশ নিতে হবে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে যৌথ নৌ-অনুশীলনে অংশ নিয়ে আন্তঃকার্যক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং মহাশক্তির দ্বন্দ্বে জড়িত না হয়ে সামুদ্রিক নিরাপত্তায় নিজের প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই — ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ আঞ্চলিক ক্ষমতার সমীকরণে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। ভারতের জন্য এটি একটি গুরুতর কৌশলগত চ্যালেঞ্জ, যা তার নিজের নীতি-দ্বারা ইরানকে ক্ষুব্ধ করে এবং কূটনৈতিক শূন্যতা তৈরি করে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও জটিল হয়েছে। ইসরায়েলকে স্বীকার করতে হবে যে, তার কর্মকাণ্ড—তাৎক্ষণিক হুমকি মোকাবিলা করলেও—পরোক্ষভাবে ঐ ‘সুন্নি ন্যাটো’ অক্ষকে শক্তিশালী করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হতে পারে। ভারতের নিজের স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ভারসাম্যপূর্ণ বহু-মিত্রতা নীতি আবশ্যক, যা সব পক্ষের সঙ্গে সংলাপ বজায় রাখে, কোনো একক পক্ষে ঝুঁকে না পড়ে।
বাংলাদেশের ভূমিকা অনন্য। এটি এই ‘মহাশক্তির খেলা’র খেলোয়াড় নয়, বরং একটি দেশ যার অর্থনৈতিক মঙ্গল ও কৌশলগত নিরাপত্তা নির্ভর করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর। একটি পরিশীলিত ‘হেজিং’ কৌশল—অংশীদারিত্বের বহুমুখীকরণ, নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিতে ফোকাস—এর মাধ্যমে বাংলাদেশ এই অস্থির সময় পার করে সম্ভাব্য ঝুঁকিকে উন্নয়নের সুযোগে পরিণত করতে পারে। মূল চাবিকাঠি হলো, নিজেকে মহাশক্তির দ্বন্দ্বের নিষ্ক্রিয় শিকার নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি সক্রিয়, নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক সেতু হিসেবে তুলে ধরা।
রেজাউল করিম
লেখক, গবেষক ও বিশ্লেষক
(রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক)