প্রসবের ভয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়েছিলেন, ৩৬ বছর পর পেট থেকে মিলল ‘পাথর শিশু’
ছবি: সংগৃহীত
০৭:৫৭ পিএম | ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
গর্ভধারণের পর সন্তান জন্ম না হলেও বছরের পর বছর পেটের ভেতরে থেকে যেতে পারে মৃত ভ্রূণ—বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন বিরল ঘটনা রয়েছে। এ ধরনের অবস্থাকে বলা হয় ‘লিথোপেডিয়ন’, সহজ ভাষায় ‘পাথর শিশু’। মায়ের শরীরের ভেতরে মৃত ভ্রূণটি দীর্ঘদিন থেকে গেলে শরীর সেটিকে ক্যালসিয়ামের স্তর দিয়ে ঘিরে ফেলে। ধীরে ধীরে সেটি শক্ত হয়ে পাথরের মতো আকার ধারণ করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এমনই এক বিরল ঘটনার কথা উঠে এসেছে। ৬০ বছর বয়সী ভারতের নাগপুরের এক নারী ২০১৪ সালে তলপেটে ব্যথা ও একটি শক্ত চাকা নিয়ে হাসপাতালে যান। প্রায় দুই মাস ধরে তার এই সমস্যা চলছিল। চিকিৎসকেরা প্রথমে ধারণা করেছিলেন, এটি হয়তো কোনো টিউমার।
ওই নারীর চিকিৎসা-ইতিহাস খতিয়ে দেখে জানা যায়, ১৯৭৮ সালে তিনি শেষবার গর্ভবতী হয়েছিলেন। তখন চিকিৎসকেরা তাকে জানিয়েছিলেন, তার গর্ভের সন্তান মারা গেছে এবং অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। অস্ত্রোপচারের ভয় পেয়ে তিনি হাসপাতাল থেকে নিজ গ্রামে ফিরে যান। এরপর আর অস্ত্রোপচার করাননি।
বছরের পর বছর মাঝেমধ্যে পেটে ব্যথা হলেও তিনি স্থানীয় চিকিৎসকের কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে তা সামলে নিতেন। প্রায় ৩৬ বছর পর তলপেটে ব্যথা ও শক্ত চাকা নিয়ে তিনি হাসপাতালে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়।
পেটের চিত্রায়ন পরীক্ষায় দেখা যায়, জরায়ুর পেছনে প্রায় ১১ বাই ৮ বাই ৮ সেন্টিমিটার আকারের একটি শক্ত পিণ্ড রয়েছে। এর ভেতরে স্পষ্টভাবে কয়েকটি হাড়ের মতো কাঠামো দেখা যায়। চিকিৎসকদের সন্দেহ হয়, এটি মৃত ভ্রূণের অবশিষ্টাংশ হতে পারে। পাশাপাশি পিণ্ডটির চাপে দুই পাশের মূত্রনালিতে সমস্যা তৈরি হয়ে কিডনিতেও প্রস্রাব জমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যায়।
পরে অস্ত্রোপচার করে পিণ্ডটি বের করা হয়। চিকিৎসকেরা দেখতে পান, একটি আবরণে ঘেরা শক্ত পিণ্ডের ভেতরে ভ্রূণের হাড় রয়েছে। পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করার পর নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি লিথোপেডিয়ন বা দীর্ঘদিন ধরে পেটের ভেতরে থাকা ক্যালসিয়াম জমে শক্ত হয়ে যাওয়া মৃত ভ্রূণ।
কীভাবে তৈরি হয় ‘পাথর শিশু’
লিথোপেডিয়ন সাধারণত জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে হতে পারে। বিশেষ করে গর্ভ জরায়ুর বাইরে, পেটের ভেতরে স্থাপিত হলে এবং ভ্রূণটি মারা যাওয়ার পরও শরীর সেটিকে শোষণ করতে না পারলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
মৃত ভ্রূণটি যদি মায়ের শরীরের জন্য খুব বড় হয় এবং সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি করে, তখন শরীর সেটিকে একটি বিদেশি বস্তুর মতো ঘিরে ফেলে। সময়ের সঙ্গে সেখানে ক্যালসিয়াম জমতে থাকে। ফলে ভ্রূণের শরীর ধীরে ধীরে শক্ত ও পাথরের মতো হয়ে যায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে পেটের বাইরে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে মৃত ভ্রূণের এমন পরিণতি অত্যন্ত বিরল। একটি প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে এ ধরনের প্রায় ৩৩০টি ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
লিথোপেডিয়নের ক্ষেত্রে কখনো শুধু ভ্রূণের হাড় অবশিষ্ট থাকে, আবার কখনো পুরো ভ্রূণই ক্যালসিয়ামের স্তরে আবৃত হয়ে শক্ত হয়ে যেতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত ভ্রূণের নরম অংশ ধ্বংস হয়ে শুধু কঙ্কালও থেকে যায়।
কয়েক দশক পরেও ধরা পড়তে পারে
লিথোপেডিয়নের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, এটি অনেক সময় কয়েক দশক পর্যন্ত মায়ের শরীরে থেকে যেতে পারে। অনেক নারী দীর্ঘ সময় কোনো বড় সমস্যা ছাড়াই এটি বহন করেন। পরে পেটে ব্যথা, চাকা বা অন্য কোনো কারণে পরীক্ষা করাতে গিয়ে বিষয়টি ধরা পড়ে।
মরক্কোর জাহরা আবুতালিবের ঘটনাও এ কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল আলোচিত। ১৯৫৫ সালে সন্তান প্রসবের সময় জটিলতার মধ্যে পড়ে তিনি হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে যান। পরে তার প্রসববেদনা বন্ধ হয়ে গেলেও সন্তান জন্ম নেয়নি। বহু বছর পর প্রায় ৪৬ বছর ধরে ভ্রূণটি শরীরে বহন করে ০০১ সালে ৭৫ বছর বয়সে পেটে প্রচন্ড ব্যথা শুরু হলে পরীক্ষায় তার শরীরে দীর্ঘদিন ধরে থাকা মৃত ভ্রূণের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেটি বের করা হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল হলেও ‘পাথর শিশু’ নিয়ে একাধিক ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনা মূলত জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ, চিকিৎসা না পাওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে মৃত ভ্রূণ শরীরে থেকে যাওয়ার বিরল পরিণতি সম্পর্কে ধারণা দেয়।
চিকিৎসকদের জন্যও বিরল অভিজ্ঞতা
চিকিৎসকেরা জানান, পেটের ভেতরে শক্ত কোনো পিণ্ড পাওয়া গেলে সেটিকে সবসময় টিউমার ধরে নেওয়া যায় না। রোগীর পুরোনো গর্ভধারণের ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং চিত্রায়ন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা সম্ভব।
দীর্ঘদিন ধরে শরীরে থাকা লিথোপেডিয়ন কখনো উপসর্গহীন থাকতে পারে। আবার এর চাপে আশপাশের অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যথা, মূত্রনালিতে বাধা বা কিডনিতে প্রস্রাব জমে যাওয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘পাথর শিশু’ নামে পরিচিত এই বিরল ঘটনা তাই শুধু বিস্ময়করই নয়, মানবদেহের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধব্যবস্থার একটি অসাধারণ উদাহরণও।
সূত্র: ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন
আরআই/টিএ