সরিষার তেলের নামে অন্য তেল, মধুতে চিনির সিরাপ দেওয়া হচ্ছে: সংসদে সানসিলা জেবরিন
ছবি: সংগৃহীত
০৮:২০ পিএম | ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সংসদ সদস্য সানসিলা জেবরিন বলেন, কোথাও সরিষার তেলের নামে অন্য তেল, কোথাও খাঁটি মধুর নামে চিনির সিরাপ, কোথাও ঘি-মাখনে নিম্নমানের চর্বি, আবার কোথাও মসলাকে আকর্ষণীয় করতে অনুপযুক্ত রং ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এসব খাদ্যও নিরাপদ নয়।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি-বিধির ৭১ বিধি অনুসারে জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয় সম্পর্কে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশ তিনি এসব কথা বলেন।
সংসদের বৈঠকে জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ের খাদ্য মন্ত্রীর মনোযোগ আকর্ষণ করে সানসিলা জেবরিন বলেন, আমরা বাজার থেকে খাবার কিনি কিন্তু নিরাপত্তা কিনতে পারি না। আমরা মোড়ক দেখি, দাম দেখি, মেয়াদ দেখি কিন্তু খাবারের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিষ দেখি না। আর এখানেই আজকের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
তিনি বলেন, আমাদের খাবারের প্লেটে এখন দুই ধরনের বিপদ একটি চোখে দেখা ভেজাল, আরেকটি চোখে না দেখা মাইক্রোপ্লাস্টিক। পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। বোতলজাত পানি থেকে শুরু করে প্লাস্টিকের পাত্রে সংরক্ষিত খাদ্য ও পানীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা হচ্ছে। আমরা অনেক সময় যে কাপকে 'কাগজের কাপ' মনে করে নিশ্চিন্তে গরম চা বা কফি পান করি, সেই কাপের ভেতরেও প্লাস্টিকের আবরণ থাকতে পারে। তাপের সংস্পর্শে সেখান থেকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পানীয়তে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে গবেষণা রয়েছে। মাইক্রোগ্লাস্টিক মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদে ঠিক কতটা ক্ষতি করে, তা নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান। কিন্তু প্রদাহ, কোষীয় ক্ষতি, হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সম্ভাব্য ব্যাঘাত এবং প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়ে বিজ্ঞানীরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষেত্রে আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, খাদ্যে ভেজালের ভয়াবহতা এখন আর শুধু ভেজাল মেশানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ভেজাল এখন এতটাই কৌশলী যে, চোখ দিয়ে দেখে ভালো আর খারাপ খাবারের পার্থক্য করাও কঠিন। ঘন দই, টকটকে লাল মরিচ কিংবা চকচকে পাকা ফল দেখতে যতই আকর্ষণীয় হোক, এর ভেতরের উপাদান কতটা নিরাপদ, একজন সাধারণ ক্রেতার পক্ষে তা জানা সম্ভব নয়। আটা, ময়দা, সুজি ও মসলা থেকে শুরু করে দুধ, দই, ঘি, মাখন, মধু, ভোজ্যতেল, পাউরুটি, কেক, বিস্কুট, নুডলস, চিপস্, মিষ্টি, আইসক্রিম, জুল, শরবত, আচার, সস এবং বোতলজাত পানি বিভিন্ন খাদ্যে বিভিন্ন সময়ে ভেজাল, দূষণ কিংবা মানগত ত্রুটির অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও ফল দ্রুত পাকানোর নামে অননুমোদিত রাসায়নিকের অপব্যবহার, কোথাও একই তেলে বারবার খাবার ভাজা, আবার কোথাও বাসি খাবারকে নতুন মসলা, রং ও সসের আড়ালে 'তাজা' হিসেবে পরিবেশন করা হচ্ছে। অর্থাৎ, রান্নাঘরের মসলা থেকে শিশুর টিফিন সকালের নাস্তা থেকে রাতের খাবার নিরাপদ খাদ্যের প্রশ্নটি আজ প্রতিটি পরিবারের প্রশ্ন।
সানসিলা বলেন, খাদ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জায়গা হলো শিশুখাদ্য। বিদেশি নাম, চকচকে মোড়ক কিংবা দামি প্যাকেজিং দেখে আমরা অনেক সময় ধরে নিই পণ্যটি নিশ্চয়ই নিরাপদ। কিন্তু আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই বিদেশি নাম নিরাপত্তার সার্টিফিকেট নয়। চকচকে মোড়ক বিশুদ্ধতার নিশ্চয়তা নয়। মোড়কের বাইরে কী লেখা আছে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়কের ভেতরে কী আছে। অনিবন্ধিত ও মানহীন শিশুখাদ্যের বিরুদ্ধে তাই আমাদের জিরো টলারেন্স থাকতে হবে। কারণ মানহীন শিশুখাদ্য একটি শিশুকে শুধু আজ অসুস্থ করে না; তার শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি আরও বলেন, রমজান এলে অভিযান, ঈদ এলে মোবাইল কোর্ট, উৎসব এলে নজরদারি এই পদ্ধতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কারণ ভেজাল কোনো মৌসুমি অপরাধ নয়। তাই নিরাপদ খাদ্যের নজরদারিও মৌসুমি হতে পারে না। আমি সরকারের কাছে কয়েকটি সুনিদিষ্ট পদক্ষেপের প্রস্তাব করছি। বোতলজাত পানি, ভোজ্যতেল, দুধ, দই, শিশুখাদ্য, গুঁড়া মশলা, বেকারি পণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের নিয়মিত ও ঝুঁকিভিত্তিক ল্যাবরেটরি পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পরীক্ষিত পণ্যের নাম, ব্র্যান্ড, ব্যাচ নম্বর এবং পরীক্ষার ফল জনগণের জন্য সহজে উন্মুক্ত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমি একটি ডিজিটাল ফুড ট্রাকেবিলিটি সিস্টেম চালুর প্রস্তাব করছি। প্যাকেটজাত খাদ্যে একটি যাচাইযোগ্য কিউআর কোড থাকবে। ক্রেতা মোবাইল ফোনে স্ক্যান করলেই জানতে পারবেন পণ্যটি কে তৈরি করেছে, কে আমদানি করেছে, উৎপাদন ও মেয়াদের তারিখ কী, প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাচের পরীক্ষার তথ্য কী। এমনকি কোনো ব্যাচে আগে ভেজাল, দূষণ বা মানগত ত্রুটি ধরা পড়লে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল সেটিও পর্যায়ক্রমে এই ব্যবস্থায় যুক্ত করা যেতে পারে। অর্থাৎ, খাবারের নিরাপত্তার তথ্য লুকিয়ে থাকবে না তা থাকবে সরাসরি ভোক্তার হাতে।
অনিবন্ধিত শিশুখাদ্য দ্রুত বাজার থেকে প্রত্যাহার করতে হবে এবং অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব পণ্যের বিক্রির ওপর কার্যকর নজরদারি বাড়াতে হবে। ভেজাল প্রমাণিত হলে শুধু সামান্য জরিমানা দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
আরআই/টিএ