শতবর্ষের রঙিন পাহারাদার: সেলুলয়েড থেকে মিশিগানের রাজপথ
ছবি: সংগৃহীত
০১:০১ পিএম | ২৩ অক্টোবর, ২০২৬
মিশিগান থেকে ফিরে:
মিশিগানের রাজপথে দাঁড়ালে মনে হয় আকাশজুড়ে যেন কোনো শিল্পীর জ্যামিতিক ক্যানভাস ঝুলছে। উজ্জ্বল হলুদ বাক্সের ওপর চওড়া কালো ফ্রেম-এই রূপ কেবল চোখের শান্তি নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে দেড়শো বছরের ইতিহাস আর নিখুঁত সড়ক প্রকৌশল।
আজকের এই ত্রিবর্ণ বাতির গল্পটা অবশ্য অনেক পুরনো। ১৮৬৮ সালে লন্ডনের রাজপথে ঘোড়ার গাড়ির ভিড় সামলাতে বিশ্বের প্রথম ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হয়েছিল। সেটি ছিল গ্যাসচালিত এবং হাতে চালিত সেমাফোর বাতি। কিন্তু সমস্যা বাঁধাল মাত্র কিছুদিন পরেই; গ্যাসের বিস্ফোরণে আহত হন এক পুলিশকর্মী। এরপর ট্রাফিক ব্যবস্থার ইতিহাস এক যুগান্তকারী মোড় নেয় মিশিগানের মাটিতে এসে। ১৯২০ সালে ডেট্রয়েট শহরের এক পুলিশ অফিসার, উইলিয়াম পটস তৈরি করেন বিশ্বের প্রথম বৈদ্যুতিক, চারমুখী ও তিন রঙের ট্রাফিক টাওয়ার। মোটর সিটির জন্মলগ্নে গাড়ির ক্রমবর্ধমান চাপ সামলাতেই তাঁর এই যুগান্তকারী উদ্ভাবন, যা বদলে দিয়েছিল পুরো পৃথিবীর চলার গতি।
রাস্তার এই বাতিগুলোর সৌন্দর্য নিছক নকশা নয়, এর প্রতিটি কোণ তৈরি বিজ্ঞানের হিসাবে। লাইটের চারপাশে যে কালো বর্ডারটি চোখে পড়ে, প্রকৌশলের পরিভাষায় তাকে বলা হয় ‘ব্যাকপ্লেট’। ভরদুপুরের তীব্র রোদ কিংবা পেছনের নীল আকাশের মাঝে এটি তৈরি করে উচ্চ বৈসাদৃশ্য বা হাই-কনট্রাস্ট। ফলে বহু দূর থেকেই চালকের চোখে স্পষ্ট ভেসে ওঠে লাল কিংবা সবুজের সংকেত। শুধু তাই নয়, ধূসর বা কালো কাঠামোর তুলনায় উজ্জ্বল হলুদ রঙের বাক্স চোখের পলকেই নজর কাড়ে। চালক অনেক আগে থেকেই গতি নিয়ন্ত্রণের মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি নিতে পারেন। বড় মোড়গুলোতে প্রতিটি লেনের মাথার ওপর সারিবদ্ধভাবে আলাদা বাতি ঝুলিয়ে রাখা হয়, যেন কোন লেনের গাড়ি কখন ছুটবে তা নিয়ে মুহূর্তের জন্যও বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।
প্রকৃতির সঙ্গে তাল মেলাতেও এই সিগন্যালের আকারে আসে বৈচিত্র্য। টেক্সাস বা ফ্লোরিডার মতো ঝড়প্রবণ অঞ্চলে তীব্র বাতাসের আঘাত এড়াতে লাইটগুলো আনুভূমিকভাবে শোয়ানো থাকে, আর মিশিগানের মতো বরফপ্রধান এলাকায় তা দাঁড়িয়ে থাকে উল্লম্ব হয়ে। লন্ডনের গ্যাসবাতি থেকে শুরু হয়ে ডেট্রয়েটের বৈদ্যুতিক আধুনিকায়ন-রাস্তার মাথার এই রঙিন সংকেতগুলো তাই কেবল যাতায়াত নিয়ন্ত্রক নয়, এগুলো শতবর্ষের ঐতিহ্য ও মানুষের জীবন বাঁচানোর এক বুদ্ধিদীপ্ত জীবন্ত ভাস্কর্য।
বিশ্বের বহু মানুষের কাছে আমেরিকান রাজপথের এই সারি সারি ঝুলন্ত বাতির দৃশ্য পরিচিত হলিউডি সিনেমার ফ্রেম থেকে। টানটান উত্তেজনার কার-চেজ দৃশ্য হোক কিংবা কোনো প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগের সিনেমা-হঠাৎ ধেয়ে আসা টর্নেডো বা কোনো মহাপ্রলয়ে যখন আস্ত শহর লন্ডভন্ড হতে থাকে, তখন বিকট শব্দে ক্যাবল ছিঁড়ে বাতাসে উন্মত্তের মতো ঝুলতে থাকা কিংবা ছিটকে উড়ে যাওয়া এই ট্রাফিক লাইটগুলোই পর্দায় তুলে ধরে ধ্বংসের চরম আবহ। আবার শান্ত কোনো বিষাদময় বিকেলে নিয়ন আলোর মাঝে স্থির দাঁড়িয়ে এগুলোই হয়ে ওঠে নগরজীবনের নীরব সঙ্গী। লন্ডনের আদিম গ্যাসবাতি থেকে ডেট্রয়েটের বৈদ্যুতিক আধুনিকায়ন-রাস্তার মাথার এই রঙিন সংকেতগুলো তাই কেবল যন্ত্র নয়; এগুলো শতবর্ষের ঐতিহ্য, রূপালি পর্দার চিরচেনা নস্টালজিয়া আর মানুষের জীবন বাঁচানোর এক বুদ্ধিদীপ্ত জীবন্ত ভাস্কর্য।
কেএন/টিএ