© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে দীপের চাঞ্চল্যকর তথ্যমদ্যপান শেষে হেরোইন খুঁজতে টঙ্গীর মাঠে যান তাহসিফ

শেয়ার করুন:
মদ্যপান শেষে হেরোইন খুঁজতে টঙ্গীর মাঠে যান তাহসিফ

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১০:২০ পিএম | ০১ নভেম্বর, ২০২৬
বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য তদন্তে তার জীবনের শেষ রাতের নানা তথ্য সামনে এসেছে। ঘটনার রাতে প্রেমিকার সঙ্গে বিরোধ, উত্তরার একটি বারে মদ্যপান, পরে টঙ্গীতে মাদক কিনতে যাওয়া এবং পুলিশের ধাওয়ায় বন্ধুর পালিয়ে যাওয়ার বিবরণ দিয়েছেন মামলায় গ্রেপ্তার তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ। তবে তাহসিফ কীভাবে তুরাগ নদে পড়ে মারা গেলেন, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি তদন্তকারীরা।

রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানান, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৮ মিনিটে তাহসিফ, জারিকা তাসনিম দিশা ও তিনি উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের নেস্ট বারে যান। কয়েক দিন আগে দিশা অন্য এক যুবকের বাসায় ইয়াবা সেবন ও তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন বলে তাহসিফ জানতে পারেন। এ নিয়ে মন খারাপ থাকায় সেদিন দিশাকে নিয়ে বারে যান তিনি।

দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, বারে গিয়ে তাহসিফ কর্তৃপক্ষকে সাউন্ড সিস্টেমে বিষণ্ন সংগীত বাজাতে বলেন। পরে তিনজনই মদ্যপান করেন। রাত ১২টা পর্যন্ত মদ্যপানের সময় দিশার সঙ্গে অন্য যুবকের সম্পর্ক নিয়ে তাহসিফের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে দিশাকে উদ্দেশ করে তাহসিফ বলেন, ‘তুমি তো ইয়াবা খেয়েছ, আমি এর চেয়েও বড় কিছু খাব। আমি হেরোইন খাব।’

রাত ১২টার দিকে বার থেকে বের হয়ে তাহসিফ নিজের মোটরসাইকেলে দিশাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসায় পৌঁছে দেন। দীপও নিজের মোটরসাইকেলে সেখানে যান। পরে দুজন টঙ্গী বাজার বস্তি-সংলগ্ন একটি মাঠের উদ্দেশে রওনা হন। ওই মাঠে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাহসিফ নিজেই নিয়েছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানান দীপ।

দীপের দাবি, মাঠের পাশে বস্তির কাছে মোটরসাইকেল রেখে তারা মাঠের দিকে যান। সেখানে স্থানীয় মাদকসেবী ও কারবারিসহ অনেক মানুষ ছিলেন। মাঠে গিয়ে তাহসিফ উচ্চস্বরে হেরোইন চেয়ে বলেন, যত টাকা লাগে তিনি দেবেন। পরে কয়েকজন মাদক কারবারির কাছ থেকে হেরোইন কিনে সেবন করেন তিনি। বারে মদ্যপানের পর মাদক সেবনে তাহসিফ নিজের ওপর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে জানান দীপ।

জিজ্ঞাসাবাদে দীপ আরও বলেন, তাহসিফ যখন মাদক সেবন করছিলেন, তখন সেখানে পুলিশের একটি টহল দল আসে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থানীয় মাদক কারবারিরা পালিয়ে যান। দীপও দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে চলে যান। পরে নদীর ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে থাকেন। এ সময় তাহসিফের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান তিনি।

দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই থেকে তিন মিনিট পর দুই পুলিশ সদস্য তাকে ঘিরে ধরেন। তারা নাম-পরিচয় ও ঠিকানা জানতে চাইলে দীপ নিজেকে ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু বলে পরিচয় দেন। তার বাসা মোহাম্মদপুরে জানালে পুলিশ সদস্যরা এত রাতে সেখানে আসার কারণ জানতে চান। দীপ বলেন, একটি কাজে এসেছেন। পরে পুলিশ সদস্যরা তাকে বাসায় চলে যেতে বললেও তিনি বস্তির সরু রাস্তা দিয়ে ভেতরে ঢুকে যান।

পুলিশকে তাহসিফের বন্ধু পরিচয় দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে দীপ দাবি করেন, বিভিন্ন প্রয়োজনে তিনি এ পরিচয় ব্যবহার করেন। ট্রাফিক পুলিশ আটকালে নিজেকে বাহিনীর ক্যাপ্টেন বলেও পরিচয় দেন। সেদিন রাতেও পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে একই পরিচয় ব্যবহার করেছিলেন।

দীপ জানান, বস্তির ভেতরে ঢুকে রাস্তা চিনতে না পেরে এক মাদকসেবীর সহায়তায় মূল সড়কে ফেরেন। পরে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে তাহসিফকে একাধিকবার ফোন করেন। তবে প্রতিবারই ফোন বন্ধ পান। তাহসিফ মাদক সেবন করতে এসেছেন, তাই মাদক না নিয়ে চলে যাবেন না বলে ধারণা করেছিলেন তিনি। এ ছাড়া তাহসিফ তার কাছ থেকে ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য একটি পাওয়ার ব্যাংক নিয়েছিলেন। তাই ফোনের চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে বলেও ভেবেছিলেন দীপ। পরে তিনি মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন। তবে তাহসিফকে পানিতে পড়তে দেখেননি বলে দাবি করেছেন তিনি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং তার বক্তব্য যাচাই করা হয়েছে। তাহসিফের মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বারের বিভিন্ন বিষয়ও যাচাই করেছেন তদন্তকারীরা। মোবাইল ফোন বিশ্লেষণসহ পারিপার্শ্বিক তথ্য বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড নয়, দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলে মনে হচ্ছে। পুলিশের উপস্থিতিতে পালানোর সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাহসিফ পানিতে পড়ে যেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে ওই কর্মকর্তা বলেন, এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। দীপের বক্তব্য আরও যাচাই করা প্রয়োজন। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অপেক্ষা করতে হবে। প্রতিবেদনে তাহসিফ মাদক সেবন করেছিলেন কি না কিংবা তার শরীরে কোনো বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না, তা-ও জানা যেতে পারে। দীপ ও দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে তাহসিফ ও দীপের টঙ্গী বাজার বস্তি-সংলগ্ন মাঠে যাওয়ার একটি ভিডিও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। ভিডিওতে তাহসিফকে বস্তির সরু রাস্তা দিয়ে মাঠের দিকে যেতে দেখা যায়। তার পেছনে হাতে হেলমেট নিয়ে যাচ্ছিলেন দীপ। এ সময় তাহসিফকে দীপের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘দীপ, ডোন্ট টক টু মাচ, লেটস ওয়াক।’

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ময়নাতদন্তের সময় তাহসিফের পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ভিসেরা ও রক্তের নমুনাও পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করেছে পুলিশ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, মরদেহটি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ছাড়া নিশ্চিতভাবে মৃত্যুর কারণ বলা সম্ভব নয়। তাহসিফ বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন, সাধারণত তার সাঁতার জানার কথা। সে ক্ষেত্রে তিনি এমন কোনো পরিস্থিতিতে পানিতে পড়েছিলেন কি না, যেখানে সাঁতার কাটার সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারেননি, সেটিও বিবেচনায় রয়েছে।

গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে দীপের ডাকে বের হন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি (২৮)। ওই রাতে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে বাসায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। তবে আর ফেরেননি। রাত ১টার দিকে তার ফোন থেকে মায়ের মেসেঞ্জারে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, ‘রওনা দিসি আসতেছি’।

পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসার খবর আসে। পরে টঙ্গী নৌপুলিশ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হয় তাহসিফের। সুরতহাল প্রতিবেদনে তার শরীরে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে জানায় পুলিশ। ২৯ অক্টোবর ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে নামে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২৯ অক্টোবর গভীর রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ অক্টোবর সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।

প্রথমদিকে দীপ দাবি করেছিলেন, একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়ে উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান তিনি। পরে টঙ্গীর মাদক স্পটে যাওয়ার কথা স্বীকার করেন। ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় শুরুতে মামলা করতে অনীহা প্রকাশ করলেও ৩০ অক্টোবর দিবাগত রাতে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

এরপর দীপকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় নৌপুলিশ। ৩১ অক্টোবর ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত পুলিশের সাত দিনের রিমান্ড আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রোববার (১ নভেম্বর) তাহসিফের সঙ্গে ঘটনার রাতে নেস্ট বারে যাওয়া তরুণী জারিকা তাসনিম দিশাকেও কাফরুলের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে নৌপুলিশ। তার সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও তাহসিফের ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দিশার সঙ্গে তার যোগাযোগ এবং ঘটনার রাতে একসঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। দীপ ও দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পরই তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

আরআই/

মন্তব্য করুন