অলস ছাদ, অফুরন্ত রোদ: বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের জ্বালানি মানচিত্র
ছবি: সংগৃহীত
০৮:০৬ পিএম | ০৪ নভেম্বর, ২০২৬
সচিবালয়ের ছাদজুড়ে এখন জ্বলজ্বল করছে সোলার প্যানেল। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনেও একই রূপান্তরের দৃশ্য। তবে এই পরিবর্তনের ধারা শুধু রাষ্ট্রীয় শীর্ষ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে ছড়িয়ে দিতে হবে সারা দেশে। কারণ এই অপার সম্ভাবনা আমাদের জন্য স্রষ্টা প্রদত্ত এক বিরাট আশীর্বাদ।আমাদের দেশে গ্রামে-গঞ্জে বাড়িতে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যে বিদ্যুতের চাষ সহজেই করা যায়। আপনার ঘরের ছাদের বিদ্যুৎ আপনার চাহিদা মিটিয়ে সরকারের কাছে বিক্রি করে টাকা পাওয়া যাচ্ছে। আর এটার জন্য যত ধরনের সহজপন্থা আছে সেটা দিতে হবে নাগরিকদের। কারণ সৌর শক্তির যে অপার সম্ভাবনা বাংলাদেশে সেখানে একটা নজিরবিহীন অগ্রগতির সুযোগ আছে। কেন এই সুযোগ সেটা আরো জানি চলুন...
ভৌগোলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩০০ দিন কড়া রোদ থাকে। এখানে প্রতি বর্গমিটারে সৌর বিকিরণের পরিমাণ ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ দশমিক ৫ কিলোওয়াট-ঘণ্টা। অথচ জার্মানি বা জাপানের মতো তুলনামূলক কম রোদের দেশগুলো শুধু ছাদের সৌরবিদ্যুৎকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় গ্রিডে যোগ করছে হাজার হাজার মেগাওয়াট। আমাদের স্কুল, কলেজ, সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্বাস্থ্যকেন্দ্র আর কারখানার লাখ লাখ বর্গফুট ছাদ এখনও ফাঁকা পড়ে আছে। প্রয়োজন কেবল সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, কার্যকর নীতিমালা এবং 'নেট মিটারিং' সুবিধার পূর্ণ প্রয়োগ। ছাদের অলস রোদই হতে পারে আয়ের নতুন উৎস—ঘরের বিদ্যুৎ খরচ মিটিয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করে সাধারণ মানুষ থেকে প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাই প্রতি মাসে সাশ্রয়ের পাশাপাশি নিশ্চিত করতে পারে বাড়তি আয়।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো ২০২৬’-এ সরকারি খাতে ছাদের সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ নিয়ে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক দিকনির্দেশনা উঠে এসেছে। সরকার প্রধান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমেই ঘোষণা দিয়েছেন আগামী বছরের অর্থাৎ ২০২৭ সালের গ্রীষ্ম মৌসুমে তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সৌর শক্তি থেকে যোগ হবে বাংলাদেশে। সরকারি হিসাবমতে, শুধু সরকারি ভবনগুলোর ছাদ থেকেই প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল সুযোগ রয়েছে। এই বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে স্বাস্থ্য খাত অগ্রণী ভূমিকা পালনের ঘোষণা দিয়েছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ কোনো সাধারণ সেবা নয়, এটি অপরিহার্য প্রয়োজন এবং সরাসরি স্বাস্থ্য নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। সরকারি উদ্যোগে সোলার রোলআউটের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ‘প্রথম চ্যাম্পিয়ন’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।
বর্তমানে দেশে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং অসংখ্য জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। এছাড়া সারা দেশের প্রায় ৫০০টি উপজেলায় বিদ্যমান হাসপাতালগুলোর শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫১ বেডে উন্নীত করার যে বৃহৎ কর্মপরিকল্পনা এগোচ্ছে, তার প্রতিটি ভবনের ছাদ হতে পারে স্বয়ংসম্পূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্র। হাসপাতালের সার্বিক ব্যস্ততা দিনের বেলাতেই শীর্ষে থাকে, যা সরাসরি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়ের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার ও টিকার কোল্ড চেইনের সুরক্ষায় ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে হাসপাতালগুলোকে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর করা সময়ের দাবি।
একই রূপরেখা তৈরি হচ্ছে দেশের শিক্ষাঙ্গন ঘিরেও। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, দেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে লক্ষাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে কোথায় কোথায় ছাদের সৌরবিদ্যুৎ বাস্তবায়ন সম্ভব, আগামী ছয় মাসের মধ্যে তা চিহ্নিত করা হবে। ইতোমধ্যে ৫০টির বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৩০টির অধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।
শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, সোলার প্যানেলসহ ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ শিল্প গড়ে তুলে দেশের তরুণদের দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলার যে ভিশন সরকার নিয়েছে, তা আমাদের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়াবে।
একই সঙ্গে বরেন্দ্র অঞ্চলে ১৭ হাজার সেচ পাম্পের সঙ্গে সোলার যুক্ত করে গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার উদ্যোগ কৃষি ও জ্বালানির মেলবন্ধনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, আন্তর্জাতিক সহজ শর্তের তহবিল এবং গ্রিডের কারিগরি স্থিতিশীলতা বজায় রাখা গেলে সৌরশক্তিই হবে ভবিষ্যতের স্বনির্ভর বাংলাদেশের প্রধান চালিকাশক্তি। ফাঁকা পড়ে থাকা ছাদগুলোকে উৎপাদনে যুক্ত করে দেশকে আত্মনির্ভরশীল গ্রিন এনার্জির যুগে পৌঁছে দেওয়ার এখনই মোক্ষম সময়।
এমআর/