তিন কিলোমিটার খাল কেটে গ্রামে পানি আনলেন ‘ওয়াটারম্যান’ ভুইয়া
২২ বছর ধরে শুধুমাত্র একটি হাঁতুড়ি আর ছেনি (পাথর কাটার ধাতব অস্ত্র বিশেষ) দিয়ে পাহাড় কেটে রাস্তা বানিয়েছেন দশরথ মাঝি। ফলে প্রান্তিক গ্রামের থেকে নিকটবর্তী শহরের ৫৫ কিলোমিটারের দুরত্বকে তিনি কমিয়ে এনেছেন ১৫ কিলোমিটারে।
ভারতের বিহার রাজ্যের গেহলওর পাহাড় কেটে এই ঐতিহাসিক রাস্তা বানিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন দশরথ মাঝি। এই কাজের কারণে দশরথ মাঝি ‘দ্যা মাউন্টেন ম্যান’ উপাধি পেয়েছেন। ভারত সরকার তার ছবি সম্বলিত ডাকটিকিটও প্রকাশ করেছে। তাকে নিয়ে সিনেমা বানানো হয়েছে।
এদিকে একই ভাবে একা হাতে ৩ কিলোমিটার খাল খনন করে নিজ গ্রামে পানির ব্যবস্থা করেছেন একই রাজ্যের কথিলওয়া গ্রামের লাউঙ্গি ভুইয়া নামের এক কৃষক। যার গল্প আমরা আজকে জানবো।
কথিলওয়া গ্রামটি থেকে নিকটতম বড় শহর গয়ার দূরত্ব ৮০ কি.মি। গ্রামের মাটির ঘরগুলোতে সব মিলিয়ে ৭৫০ জন লোকের বসবাস। এদের প্রায় সবাই নিচু বর্ণের হিন্দু (অচ্ছুত) বা দলিত শ্রেণীর লোক। পানির অভাবে চাষাবাদ করতে নিদারুন সমস্যায় ভুগতে হতো বাসিন্দাদের। তবে ভুইয়া সব সময় বলতেন, আমি একদিন তোমাদের জন্য পানি নিয়ে আসবো।
তিনি জানতেন, বর্ষার বৃষ্টিতে পার্শ্ববর্তী বাঙ্গেথা পাহাড়ে বেশ কয়েকটি জলধারার সৃষ্টি হয়, খাল কেটে সেগুলি গ্রামের দিকে নিয়ে আসা গেলে পানির সমস্যা অনেকটাই মিটে যাবে। দশরথ মাঝিকে অনুপ্রেরণা করে নিজের সামান্য কোদাল হাতেই কাজে লেগে পড়লেন ভুইয়া।
গণমাধ্যমকে এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, ‘আমি দশরথ মাঝির কথা শুনেছি এবং ভেবেছি সে পারলে আমি পারবো না কেন?’
এই ভাবনা থেকেই শত অভাব অনটনকে পাশ কাটিয়ে প্রতিদিন একা হাতে খাল খনন করে যেতে লাগলেন তিনি।

গ্রামবাসীরা সবাই তাকে পাগল ভাবতে শুরু করলো, এমনকি ভুইয়ার বউও তাকে ‘পাগল’ বলে ডাকতেন। মাঝে মধ্যে রেগে গিয়ে তাকে খাবার দেয়া বন্ধ রাখতেন, বলতেন ছেলেদেরকে কাজে সহায়তা করতে।
পরিবারের লোকেরা তার এই ভূত ছাড়াতে তাকে ওঝার কাছেও নিয়ে গিয়েছিল। তবে কোনো কিছুই ভুইয়াকে দমাতে পারেনি। তিনি খাল খননের কাজ চালিয়ে যেতে লাগলেন। ভুইয়ার চার ছেলে অভাবের তাড়নায় কাজের অন্বেষণে শহরে চলে যেতে বাধ্য হলো। ভুইয়া খাল কেটেই চললেন।
এভাবে ৩০ বছর ধরে খননের পর খালের দৈর্ঘ্য দাঁড়াল ৩ কিলোমিটার। আর মাত্র ১ কিলোমিটার দূরেই তার প্রিয় গ্রাম। এমন সময় তাদের গ্রামে স্থানীয়দের উদ্যোগে তৈরি একটি রাস্তার ওপর সংবাদ সংগ্রহ করতে একজন সাংবাদিকের আগমন ঘটল। ভুইয়া তাকে নিজের বানানো খালটির কথা জানালেন। একটি হিন্দী পত্রিকায় গত ৩ সেপ্টেম্বর এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলো। এরপর একের পর এক গণমাধ্যমে ভুইয়ার খালের খবর প্রকাশিত হতে শুরু করলো।
দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে স্থানীয় প্রশাসনের এ বিষয়ে কোনো মাথাব্যথা না থাকলেও, এবার তারা নড়েচড়ে বসলেন। ভুইয়াকে খাল খননে বাঁধা দেয়া হলো। বিহার রাজ্যের পানি মন্ত্রীর উদ্যোগে খালটি পৌছে দেয়া হলো ভুইয়ার গ্রামের দোড়গোড়ায়। আর এভাবেই দীর্ঘ ৩০ বছরের সাধানায় নিজ গ্রামে পানি আনলেন লউঙ্গি ভুইয়া।
ভুইয়ার স্ত্রী দেবী বলেন, ‘সংসারে মনোযোগী না হওয়ায় আমি তার ওপর সব সময় রেগে থাকতাম। ঘরে কখনোই প্রয়োজনীয় টাকা কিংবা খাবার ছিল না।’
তবে এখন তিনি আনন্দিত, গ্রামবাসীরা তার স্বামীকে ‘ওয়াটারম্যান’ বা ‘রিভারম্যান’ বলে ডাকে। ভুইয়ার নিঃস্বার্থ এই অবদানের ফলে এবছর কথিলওয়ার বাসিন্দারা গম চাষ করতে পারছে। তথ্যসূত্র: আলজাজিরা
টাইমস/এনজে/এসএন