দেশে এত ঘন ঘন ‘মব’ সৃষ্টির কারণ নিয়ে যা ভাবছে বিশেষজ্ঞরা
ছবি: সংগৃহীত
০৩:১৪ পিএম | ০৬ মার্চ, ২০২৫
”জমিজমার ঝামেলা মেটানোর কথা বলে আত্মীয়ের বাসা থেকে ডেকে নিয়ে দুই চোখ তুলে নেওয়া হলো, আঙুল কেটে দেওয়া হলো। ৪০-৫০ জন মিলে পিটিয়েছে। কাঁচি দিয়ে খুঁচিয়ে চোখ তুলেছে। ওরা চোখ-আঙুল ফেরত দিতে পারবে? পুলিশের সহযোগিতা চেয়েও পাইনি।” এমন হাহাকার করেছেন ভোলার চরফ্যাসন উপজেলায় বর্বরোচিত হামলার শিকার এক ব্যক্তির স্ত্রীর। চোখের আলো হারিয়ে ভুক্তভোগী ব্যক্তি এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এই ঘটনার মতো দেশের অনেক জায়গাতেই একের পর এক মব সহিংসতার শিকার হচ্ছেন অনেকে। কিছু ঘটনায় টার্গেট করেও দলবদ্ধ হামলা করা হচ্ছে। নিরপরাধ ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, বিদেশি নাগরিকসহ অনেকেই এ ঘটনায় ভুক্তভোগী। সন্দেহের গণপিটুনিতে অনেকেই প্রাণ হারাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণআন্দোলনে সরকার পতনের পর পুলিশের ঢিলেঢালা ভাব ও নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে অনেকে দলবদ্ধ হয়ে আইন হাতে তুলে নিচ্ছেন। তাৎক্ষণিক ‘শাস্তি’ নিশ্চিত করার যে প্রবণতা সমাজে দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে উৎকণ্ঠা। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানানো হলেও মব সহিংসতা বন্ধ হচ্ছে না।
সম্প্রতি মধ্যরাতে ‘মব’ তৈরি করে গুলশানে সাবেক এমপি তানভীর ইমামের সাবেক স্ত্রীর বাসায় ঢুকে তল্লাশির নামে মালপত্র তছনছ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। আবার এর আগে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় লুটপাট ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গণপিটুনিতে দুজনকে হত্যা করা হয়। একই দিন গাজীপুরে যাত্রীবাহী বাসকে সাইড দেওয়া নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার জেরে রিটন মিয়া নামে এক অটোরিকশার চালকে হাত ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয়।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালে গণপিটুনির ঘটনা ২০১টি। এতে নিহত ১৭৯ ও আহত ৮৮ জন। ২০২৩ সালে ঘটনা ১১৪, নিহত ৭৩ ও আহত ৯১ জন। এই হিসাবে ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি। ২০২২ সালে ৭৯টি ঘটনায় নিহত ৩৮ ও আহত ৮৩ জন। ২০২১ সালে ৮৩ ঘটনায় নিহত ৪৮ ও আহত ৮৫ জন। এ ছাড়া আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে গণপিটুনিতে মারা গেছে ১৬ ও ফেব্রুয়ারিতে ১১ জন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাত মাসে দেশে গণপিটুনির অন্তত ১১৪টি ঘটনা ঘটেছে। এতে ১১৯ জন নিহত এবং ৭৪ জন আহত হয়েছেন। আর গত ১০ বছরে গণপিটুনিতে মারা গেছেন কমপক্ষে ৭৯২ জন। আহত হয়েছেন ৭৬৫ জন।
এদিকে অপরাধ ও সমাজ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, মব সহিংসতার নামে উচ্ছৃঙ্খল জনতার সহিংসতা দেখছি। মব সহিংসতা ছোঁয়াচে রোগের মতো। এটা ব্যক্তি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে তৈরি করা হচ্ছে। এসব মব ভায়োলেন্সে কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসহায়ত্ব দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মব জাস্টিসের নামে জোটবদ্ধ হয়ে হামলা-ভাঙচুরের অনেক ঘটনা পরিকল্পিতভাবে ঘটছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান বা কর্মকর্তাকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা, মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়া, আদালত এলাকায় আসামিদের ওপর হামলা এক ধরনের প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে ঘটছে।
৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে আক্রমণ ও মাজারে মাজারে হামলা হচ্ছে। এসব হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ দেশজুড়ে যে পরিস্থিতি তৈরি করছে, তা শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম না হলে স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। হানাহানি ও বিদ্বেষ বাড়বে।পুলিশের শৈথিল্যের সুযোগে এমন ঘটনা একের পর এক ঘটছে কিনা– এমন প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
টিএ/