কুষ্টিয়ায় ৬ হত্যা

হানিফের মামলায় প্রথম, ইনুর বিরুদ্ধে চতুর্থ দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ আজ

জুলাই অভ্যুত্থান ঘিরে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষ্যগ্রহণ আজ। একইসঙ্গে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে চতুর্থ দিনের সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে।

সোমবার (৮ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ সাক্ষ্যগ্রহণ পেশ হবে।

এর মধ্যে গত ২৫ নভেম্বর হানিফের মামলায় সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন শেষে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আজকের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। সূচনা বক্তব্যে মামলার বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরার পাশাপাশি সাক্ষীর তালিকা, অডিও-ভিডিও, পত্রপত্রিকার তথ্যপ্রমাণের বিবরণ দেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। 

একইসঙ্গে এ অপরাধের দায়মুক্তির সুযোগ নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ করার কারণে যেন বিচার না হয়; এমন আর্জি জানান চার আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন।

হানিফ ছাড়া বাকি তিন আসামি হলেন- কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা।

এ মামলায় মোট সাক্ষী ৩৮ জন। এর মধ্যে শহীদ পরিবারের ৮, প্রত্যক্ষদর্শী ৮, আহত ৮, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ৬, পুলিশ ১, সাংবাদিক ১, জব্দতালিকা ২, বিশেষজ্ঞ ২, বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ১ ও মূল তদন্ত কর্মকর্তা ১ জন রয়েছেন। 

এর আগে, ২ নভেম্বর হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। একইসঙ্গে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনসহ সাক্ষ্যের জন্য আজকের দিন ঠিক করা হয়। বিচার শুরুর আদেশের দিন চারজনের বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগ পড়া হয়। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, আবদুস সাত্তার পালোয়ান।

গত ২৮ অক্টোবর হানিফসহ পলাতক চার আসামির পক্ষে অভিযোগ পড়েন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। শুরুতেই তিনি ফরমাল চার্জে প্রসিকিউশনের আনা পটভূমি নিয়ে সমালোচনা করেন। এরপর সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ পড়ে আসামিদের অব্যাহতির আবেদন করেন। এর আগের দিন তথা ২৭ অক্টোবর এ নিয়ে শুনানি শেষ করে প্রসিকিউশন। ২৩ অক্টোবর হানিফসহ চারজনকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার কথা ছিল।

তবে পলাতক থাকায় আইনানুযায়ী তাদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। ১৪ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে এই চারজনকে হাজির হওয়ার নির্দেশ ছিল। না আসায় তাদের গ্রেপ্তারে জাতীয় দৈনিক দুটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আদেশ দেওয়া হয়। ৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ৫ অক্টোবর তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেন প্রসিকিউশন। এতে সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে রয়েছে উসকানিমূলক বক্তব্য, ষড়যন্ত্র ও কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যা।

অপরদিকে, হত্যা, উসকানি, ষড়যন্ত্রসহ সুনির্দিষ্ট আট অভিযোগে ইনুর বিরুদ্ধে তৃতীয় দিনের মতো সাক্ষ্য ও জেরা শেষ হয় রোববার (৭ নভেম্বর)। এদিন জব্দতালিকার সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তদন্ত সংস্থার রেকর্ড সংরক্ষণকারী এসআই মো. কামরুল হোসেন। পরে তাকে জেরা করেন ইনুর আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। 

গত ২ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দিনের জেরা শেষ হয়। ওই দিন দুই নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়া বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহাকে জেরা করেন ইনুর আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। এর আগের দিন ১ ডিসেম্বর সাক্ষ্য দেন তিনি।এ মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে একই দিন জবানবন্দি দিয়েছেন মো. রাইসুল হক। তার বাড়ি মেহেরপুরে হলেও জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় কুষ্টিয়া শহরের একটি মেসে থাকতেন। ছাত্র-জনতার ওপর হামলার প্রত্যক্ষ নির্দেশদাতা ও উসকানিদাতা হাসানুল হক ইনু ছিলেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তার কপালেও গুলি লেগেছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেছেন। এছাড়া ছয়জন শহীদ হয়েছিলেন। এসবের জন্য ট্রাইব্যুনালের কাছে ইনুর সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছেন এই সাক্ষী।

এর আগে, ৩০ নভেম্বর মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। একই দিন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিরুদ্ধে ইনুর করা রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি হয়। তার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সিফাত মাহমুদ ও মনসুরুল হক। প্রসিকিউশনের পক্ষে করেন চিফ প্রসিকিউটর। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ইনুর আবেদনটি খারিজ করে দেন ট্রাইব্যুনাল। গত ২ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।

উল্লেখ্য, জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। তাদের গুলিতে শহীদ হন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ। আহত হন বহু নিরীহ মানুষ। এর পরিপ্রেক্ষিতে এই চারজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়। পরে তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এছাড়া কুষ্টিয়ায় ছয় হত্যার ঘটনাসহ আরও সাতটি অভিযোগ আনা হয় ইনুর বিরুদ্ধে।

কেএন/টিকে

Share this news on:

সর্বশেষ

img
দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ২৩ বছরের কারাদণ্ড Jan 22, 2026
img
সিলেটের হারের কারণ ব্যাখ্যা করলেন কোচ Jan 22, 2026
img
বিএনপিতে গুপ্ত রাজনীতিক আছে : মাসুদ কামাল Jan 22, 2026
img
ইউরোপকে ভালোবাসি, কিন্তু তারা ঠিক পথে নেই: ট্রাম্প Jan 22, 2026
img
নীলফামারী-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপি নেতাকে বহিষ্কার Jan 22, 2026
img
হাফিজ উদ্দিন খানের মৃত্যুতে প্রধান উপদেষ্টার গভীর শোক Jan 22, 2026
img
‘এটি রাশিয়ার বিষয় নয়’, গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে কেন উচ্ছ্বসিত পুতিন? Jan 22, 2026
img
বিএনপি ক্ষমতায় আসলে দলের চেহারা এমন থাকবে না : মাসুদ কামাল Jan 22, 2026
img
তারেক রহমানের জনসভায় মানুষের ঢল Jan 22, 2026
img
শহীদের কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে বগুড়ায় জামায়াত প্রার্থীর প্রচারণা শুরু Jan 22, 2026
img
তাদের জন্য খারাপ লাগছে না : পরীমণি Jan 22, 2026
img
বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা প্রকাশ ইরানের Jan 22, 2026
img
এবার বিএনপি থেকে সাবেক প্রতিমন্ত্রী বহিষ্কার Jan 22, 2026
img
জেনে নিন রুপার আজকের বাজারদর Jan 22, 2026
img
আমি মানুষের সেবা করতে এসেছি : বাবর Jan 22, 2026
img
নির্বাচনী প্রচারণায় কী কী করতে পারবেন প্রার্থীরা Jan 22, 2026
img
‘গড়তে চাই নতুন ও নিরাপদ বাংলাদেশ’ Jan 22, 2026
img
স্বর্ণের বাজারে বড় লাফ, ভরি কত? Jan 22, 2026
img
জামায়াতের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত Jan 22, 2026
img
শাহরুখকে কাকু বলিনি : হান্দে এরচেল Jan 22, 2026