বিশ্বের বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে শীর্ষ অবস্থানে থাকা মার্কিন বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা তাদের নেতৃত্ব হারিয়েছে। ২০২৫ সালে বিক্রির হিসেবে টেসলাকে পেছনে ফেলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাতা হিসেবে উঠে এসেছে চীনা কোম্পানি বিওয়াইডি।
স্কাই নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে টেসলা মোট ১৬ লাখ ৪০ হাজার গাড়ি ডেলিভারি দিয়েছে। যা আগের বছরের তুলনায় ৯ শতাংশ কম। এটি টেসলার জন্য টানা দ্বিতীয় বছর বিক্রি কমার ঘটনা। অন্যদিকে একই সময়ে বিওয়াইডি বিক্রি করেছে প্রায় ২২ লাখ ৬০ হাজার ইলেকট্রিক গাড়ি। যা তাদের বৈশ্বিক বাজারে শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, টেসলার এই পিছিয়ে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলন মাস্কের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঘিরে বিনিয়োগকারী ও ভোক্তাদের মধ্যে তৈরি হওয়া অস্বস্তি। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় নেওয়া কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং মাস্কের প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থান টেসলার ব্র্যান্ড ইমেজে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে, বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ায় চীনা ইভি নির্মাতাদের তীব্র প্রতিযোগিতাও টেসলার বিক্রি কমার অন্যতম কারণ। তুলনামূলক কম দামে উন্নত প্রযুক্তির গাড়ি সরবরাহ করে বিওয়াইডিসহ অন্যান্য চীনা কোম্পানি দ্রুত বাজার দখল করছে।
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর- এই তিন মাসে টেসলা বিক্রি করেছে ৪ লাখ ১৮ হাজার ২২৭টি গাড়ি। কিন্তু বাজার বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছিল প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার গাড়ি বিক্রির। প্রত্যাশার তুলনায় এই ঘাটতি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ৭ হাজার ৫০০ ডলারের বৈদ্যুতিক গাড়ি কর ছাড় (ট্যাক্স ক্রেডিট) সেপ্টেম্বরের শেষে ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করে নেওয়ায় টেসলার বিক্রি নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। এই সুবিধা উঠে যাওয়ার ফলে অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা গাড়ি কেনা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও টেসলার শেয়ার বাজারে পুরোপুরি হতাশাজনক চিত্র দেখা যায়নি। ২০২৫ সাল শেষে টেসলার শেয়ারের দাম প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে। বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী যে ভবিষ্যতে রোবোট্যাক্সি সেবা এবং মানবসদৃশ রোবট (হিউম্যানয়েড রোবট) প্রযুক্তিতে টেসলা বড় সাফল্য দেখাতে পারে।
ইলন মাস্ক ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, টেসলা ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় চালিত রোবোট্যাক্সি এবং ঘর ও অফিসে ব্যবহারের উপযোগী রোবট তৈরি করে প্রযুক্তি খাতে নেতৃত্ব দিতে চায়। এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার ওপর ভর করেই বিনিয়োগকারীরা টেসলার দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে আছেন।
বিক্রি বাড়ানোর লক্ষ্যে টেসলা সম্প্রতি তাদের জনপ্রিয় মডেল ওয়াই এবং মডেল থ্রির কম খরচের সংস্করণ বাজারে এনেছে। নতুন মডেল ওয়াইয়ের দাম রাখা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার ডলারের নিচে। আর মডেল থ্রি পাওয়া যাচ্ছে ৩৭ হাজার ডলারেরও কম দামে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে চীনা গাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতা জোরদার করা।
এদিকে বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে টেসলার আয় ও মুনাফা আরও কমতে পারে। ফ্যাক্টসেটের তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানির বিক্রি প্রায় ৩ শতাংশ কমবে এবং শেয়ারপ্রতি আয় প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ২০২৬ সালের শেষের দিকে টেসলার বিক্রি ও মুনাফা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বৈদ্যুতিক গাড়ির বৈশ্বিক বাজারে টেসলার আধিপত্যে এখন বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। চীনের বিওয়াইডি-এর উত্থান ইভি শিল্পে নতুন প্রতিযোগিতার যুগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যেখানে দাম, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতাই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব নির্ধারণ করবে।
আরআই/টিকে