ওয়াশিংটনের এমন পরিকল্পনা ইউরোপীয় মিত্রদের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে আনার যে লক্ষ্য, তাতে অনড় ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
বুধবার তাদের শীর্ষ কূটনীতিক মার্কো রুবিও আগামী সপ্তাহে ডেনমার্কের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের ঘোষণা দিলেও দ্বীপটি কব্জায় নেওয়ার পরিকল্পনা থেকে যে তারা বিন্দুমাত্র পিছু হটছেন না তার ইঙ্গিতও দিয়েছেন, বলেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক অভিযানের পর গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য ইউরোপীয় মিত্রদের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি ও কানাডাসহ নেটোর প্রভাবশালী দেশগুলো এই পরিস্থিতির বিপরীতে ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মার্কো রুবিও জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিকল্প এখনও খোলা রেখেছেন। জোরপূর্বক গ্রিনল্যান্ড নেওয়ার চেষ্টা নেটো জোটকে বিপন্ন করবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “একজন কূটনীতিক হিসেবে আমরা সবসময় ভিন্ন উপায়ে বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করতে পছন্দ করি, যেমনটা ভেনেজুয়েলাও ক্ষেত্রেও ছিল।”
তবে ডেনমার্কের মতো দীর্ঘদিনের মিত্রের কাছ থেকে খনিজ সমৃদ্ধ এই দ্বীপটি জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা নেটোকে জোর ধাক্কা দেবে এবং ট্রাম্প ও ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করবে বলেই অনেকে মনে করছেন।
মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান অনেক সেনেটরই গ্রিনল্যান্ড দখলের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করতে আইন পাসের কথাও ভাবছেন। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝামাঝি অবস্থিত গ্রিনল্যান্ড কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দশক ধরে এটি মার্কিন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বলে বিবেচিত হচ্ছে। তাছাড়া গ্রিনল্যান্ডের খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে খনিজ পণ্যের জন্য চীনের ওপরও নির্ভরতা কমাতে পারবে ওয়াশিংটন।
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদেই গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে আনার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন। দ্বীপটিকে মার্কিন সামরিক কৌশলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে ডেনমার্ক এর সুরক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে তার।
রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট এমন অভিযোগ করলেও ১৯৫১ সাল ও ২০২৩ সালে হওয়া দুটি চুক্তির বলে দ্বীপটিতে মার্কিন সেনাদের অবাধ যাতায়াতের সুযোগ এমনিতেই রয়েছে। তারপরও ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডকে পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের করে নিতে চাইছেন।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য সব বিকল্পই টেবিলে থাকে, তবে প্রেসিডেন্টের প্রথম পছন্দ সবসময়ই কূটনীতি।”তবে ট্রাম্পের দলের সেনেটর মিচ ম্যাককনেল প্রেসিডেন্টের এ পরিকল্পনাকে ‘বিপর্যয়কর কৌশলগত আত্মঘাতী পদক্ষেপ’ আখ্যা দিয়েছেন।
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ এবং নেটোর আওতাভুক্ত হওয়ায় ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এর মধ্যেই এই ইস্যুতে ডেনমার্কের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।
ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো বলেছেন, তিনি জার্মানি ও পোল্যান্ডের সাথে এ বিষয়ে যৌথ পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করবেন। ইউরোপীয় ইউনিউন কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক আইনের কোনো লঙ্ঘনই মেনে নেওয়া হবে না।
গ্রিনল্যান্ডের রাজনীতিবিদ আজা কেমনিটজ রয়টার্সকে বলেছেন, “গ্রিনল্যান্ড কখনও বিক্রির জন্য ছিল না এবং কখনও হবেও না।” প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করে আসছেন যে, গ্রিনল্যান্ডের জলসীমায় চীন ও রাশিয়ার জাহাজ এবং প্রভাব বাড়ছে।
তবে ডেনমার্ক এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ডেনিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকে রাসমুসেন সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “চীনা ও রুশ জাহাজ নিয়ে যে জল্পনা কল্পনা তৈরি হচ্ছে তা সঠিক নয়। এখন চিৎকার-চেঁচামেচির বদলে বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ প্রয়োজন।” গ্রিনল্যান্ডের আশেপাশে এখন কোনো রুশ বা চীনা জাহাজের উপস্থিতি পায়নি মেরিন ট্রাফিকও।
এসএস/এসএন