বাঘ-হাতি শিকারে ১২ বছরের জেল ও জরিমানা ১৫ লাখ টাকা

ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তন এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় দেশের জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে অন্তর্বতী সরকার।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে প্রকাশিত ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ’ জারি করে তা বিজি প্রেসের ওয়েবসাইটে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ড. মো. রেজাউল করিম এ তথ্য জানান।

নতুন বিধান নিশ্চিত করা হয়েছে।

বাঘ আইনের মাধ্যমে বন্যপ্রাণী শিকার, নিষ্ঠুর আচরণ এবং বনজ সম্পদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর শাস্তির বা হাতির মত ঐতিহ্যবাহী প্রাণী শিকারের দায়ে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড এবং ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

এই অধ্যাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৬ নামে অভিহিত হবে। এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।

নতুন অধ্যাদেশটি অন্তর্বর্তী সরকারের একটি যুগান্তকারী অধ্যাদেশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

বাঘ ও হাতি শিকারে কঠোর শাস্তি

নতুন অধ্যাদেশে বাঘ বা হাতি শিকারের অপরাধে দণ্ড বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। ধারা ৪১ ও ৪৪ অনুযায়ী, তফসিল-১(ক) ভুক্ত বাঘ বা হাতি শিকারের জন্য সর্বনিম্ন ২ বছর এবং সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার এই অপরাধ করলে তার সাজা বেড়ে ১২ বছর কারাদণ্ড এবং ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে উন্নীত হবে। এছাড়া বাঘ বা হাতির ট্রফি, মাংস বা দেহাংশ অনুমতি ছাড়া দখলে রাখলেও ৫ বছর পর্যন্ত সাজার বিধান রাখা হয়েছে নতুন অধ্যাদেশে।

অভয়ারণ্য ও রক্ষিত এলাকায় বিধি-নিষেধ

অধ্যাদেশে অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যানের সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত গ্রহণকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। রক্ষিত এলাকার ২ কিলোমিটারের মধ্যে কোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না।

অভয়ারণ্যের ভেতরে চাষাবাদ, খনিজ সম্পদ আহরণ, আগুন লাগানো এবং আগ্রাসী প্রজাতির বিদেশি উদ্ভিদ প্রবেশ করানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে বন-নির্ভর জনগোষ্ঠীর প্রথাগত অধিকার ও জীবিকার প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে অধ্যাদেশে।

অধ্যাদেশে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন বৃক্ষ, ঐতিহ্যবাহী স্মারক বৃক্ষ, পবিত্র বৃক্ষ এবং প্রথাগত ‘কুঞ্জবন’ সংরক্ষণের বৈপ্লবিক ধারা যুক্ত করা হয়েছে।

কোনো ব্যক্তি জীবন রক্ষার প্রয়োজন ছাড়া এসব বৃক্ষ বা বন ধ্বংস করতে পারবেন না। এই বিধান অমান্য করলে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

অধ্যাদেশে আরো বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্যপ্রাণী ক্রয়-বিক্রয়ের বিজ্ঞাপন দেওয়া বা বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের ভিডিও প্রকাশ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া লাইসেন্স বা পজেশন সার্টিফিকেট ছাড়া কোনো বন্যপ্রাণী বা ট্রফি (চামড়া, হাড়, দাঁত ইত্যাদি) নিজের দখলে রাখা বা কেনাবেচা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বন্যপ্রাণীর উদ্ধার, শুশ্রুষা এবং সংরক্ষণের জন্য সরকার ‘বন্যপ্রাণী ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠন করবে। এছাড়া বন্যপ্রাণী পাচার রোধে বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও সমুদ্রবন্দরগুলোতে পুলিশ, কাস্টমস ও বিজিবির সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ‘বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট’ কাজ করবে। বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত আইনি জটিলতা নিরসনে একটি ‘বৈজ্ঞানিক কমিটি’ গঠন করা হবে যা আন্তর্জাতিক সাইটিস কর্তৃপক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবে।

ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রথাগত অধিকার রক্ষা

অধ্যাদেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতি সম্মান জানিয়ে বলা হয়েছে, এই অধ্যাদেশ প্রণয়নের পূর্বে তাদের প্রথাগত ঐতিহ্য হিসেবে সংগৃহীত বন্যপ্রাণীর ট্রফি বা স্মৃতিচিহ্নের ক্ষেত্রে জব্দকরণের বিধান প্রযোজ্য হবে না।

অধ্যাদেশের অধীনে বন কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়াই অপরাধীকে গ্রেফতার করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া জব্দকৃত দ্রুত পচনশীল দ্রব্য তাৎক্ষণিক ধ্বংস বা অপসারণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

সংক্ষুদ্ধ ব্যক্তি দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করার সুযোগ পাবেন।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বিধান

অধ্যাদেশে বন্যপ্রাণীর আক্রমণে জানমালের ক্ষতি হলে এবং রক্ষিত এলাকার ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জীবিকা বিঘ্নিত হলে সরকার তাদের ক্ষতিপূরণ দেবে। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার যেকোন সময় এয়ারগান আমদানি ও ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবে।

অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার জন্য ‘সহ-ব্যবস্থাপনা’ পদ্ধতি কার্যকর করা হবে।

উল্লেখ্য, এই অধ্যাদেশ জারির ফলে ২০১২ সালের ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন’ রহিত করা হয়েছে।

এমকে/এসএন

Share this news on:

সর্বশেষ

img
সাভারে হত্যা মামলার আসামি ধরতে গিয়ে হামলার শিকার পুলিশ Jan 10, 2026
img
প্রার্থিতা ফিরে পেতে ৬৪৫ আপিল, শনিবার শুরু শুনানি Jan 10, 2026
img
মির্জাপুরে আওয়ামী লীগ নেতার পদত্যাগ Jan 10, 2026
img
খ্যাতির শিখরে থেকেও সাদামাটা জীবন শ্রেয়ার Jan 10, 2026
img
পর্তুগালের বিলাসবহুল প্রাসাদে রোনালদো-জর্জিনার রাজকীয় জীবন Jan 10, 2026
img
একসঙ্গে যে সুখবর পেলেন বিএনপির ১২ নেতা Jan 10, 2026
img
ইরানের রাজধানীতে গুলিতে প্রাণ গেল ২০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীর Jan 10, 2026
img
আমি খালেদা জিয়ার একজন ভক্ত : উপদেষ্টা আসিফ নজরুল Jan 10, 2026
img
পুতিনকে উত্তর কোরিয়ার চিঠি, সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি Jan 10, 2026
img
বিক্ষোভের মুখে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করার কথা স্বীকার করল ইরান সরকার Jan 10, 2026
img

আন্দোলনকারীদের মোবাইলে দেওয়া হচ্ছে সতর্কতা

সহিংস রাতের পর ইরানে আবারও বিক্ষোভ শুরু Jan 10, 2026
img
ইরানে বিক্ষোভকারীদের হামলায় বিপ্লবী গার্ডের ৮ সদস্য নিহত Jan 10, 2026
img
কাজ থেকে বিরতিতে শ্বেতা ভট্টাচার্য, কারণ জানালেন অভিনেত্রী Jan 10, 2026
img
বিএনপির চেয়ারম্যান হওয়ায় তারেক রহমানকে জি এম কাদেরের অভিনন্দন Jan 10, 2026
img
ঝলমলে পার্টি নয়, পরিবারকে নিয়েই জন্মদিন উদযাপন নুসরাতের Jan 10, 2026
img
তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন শহরে ফের রাজপথে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী Jan 10, 2026
img
ইরানে হস্তক্ষেপে প্রস্তুত থাকুন, ট্রাম্পকে রেজা পাহলভি Jan 10, 2026
img

জুলাইকন্যা সুরভীর বিরুদ্ধে মামলা

তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আদালতের নির্দেশ Jan 10, 2026
img
জাল ভোট ও অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে ইসির কঠোর নির্দেশনা Jan 10, 2026
img
২০২২ সালের পর ইরানে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ Jan 10, 2026