সুশাসনের ঘাটতিতে লুটপাটের শিকার ইসলামী ব্যাংকিং: গভর্নর

সাধারণ ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ইসলামী ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের সন্তোষজনক মুনাফা দিতে সক্ষম হয়। তবে সুশাসন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় এই খাতে কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিপুল অর্থ লুটপাটের সুযোগ নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।

গভর্নর বলেন, নীতিগতভাবে সম্পদ ও আয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকায় ইসলামী ব্যাংকিংকে সবচেয়ে নিরাপদ ঋণ ব্যবস্থা হিসেবে ধরা হয়। তবে বাস্তবে বাংলাদেশে এই নীতির সঠিক বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং কিছু গোষ্ঠীর দখলদারির কারণে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে গ্রাহক ও আমানতকারীরা বড়ো ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি জানান, এ অনিয়মের দায় কোনো একক পক্ষের নয়; নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও শরীয়াহ বোর্ড নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। একইসঙ্গে আমানতকারীরাও তাদের অর্থ কোথায় ও কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশ্ন তোলেননি।

শনিবার (১০ জানুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘আন্তর্জাতিক ইসলামী অর্থায়ন ও ব্যাংকিং সম্মেলন’-এর দ্বিতীয় দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন গভর্নর। দুদিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করে সেন্ট্রাল শরীয়াহ বোর্ড ফর ইসলামিক ব্যাংকস অব বাংলাদেশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগ।

ইসলামী ব্যাংকিং শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মন্তব্য করে গভর্নর বলেন, ইসলামী ব্যাংকিং কেবল ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকিংয়ের এক চতুর্থাংশের বেশি শেয়ার ইসলামী ব্যাংকগুলোর। শরিয়াহ ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকিংয়ে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়। আর বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং মানুষের সচেতন পছন্দের ফল। ভবিষ্যতে এ খাত আরো বিস্তৃত হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের একটি বড়ো অংশ শরীয়াহভিত্তিক হলেও ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য বিনিয়োগের সুযোগ এখনো সীমিত। এ কারণে এসব ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য শরীয়াহভিত্তিক বন্ড বা সুকুক বাজার গড়ে তোলার প্রয়োজন।

সম্মেলনে গভর্নর বলেন, বর্তমানে দেশের মোট আর্থিক সম্পদের একটি বড়ো অংশ ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অধীনে থাকায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বও বেড়েছে। এ সম্পদ যেন সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং আমানতকারীরা ভালো রিটার্ন পান, সেটি নিশ্চিত করাই এখন নিয়ন্ত্রকদের প্রধান দায়িত্ব।

ইসলামী ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরাতে সম্প্রতি পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে উল্লেখ করেন গভর্নর বলেন, একইসঙ্গে দেশের সবচেয়ে বড়ো ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে দেশে অন্তত দুটি বড়ো ও শক্তিশালী ইসলামী ব্যাংক গড়ে উঠবে, যারা সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আমানতকারীদের ভালো রিটার্ন দেবে।

গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ইসলামী ব্যাংকগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা হারায়নি। গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি আমানত এসেছে ইসলামী ব্যাংকগুলোতে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া সহায়তার অর্থ ফেরত দিয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ।

ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়েছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, এ লক্ষ্যে একটি নতুন ইসলামী ব্যাংকিং আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। শরিয়াহ বোর্ডের ভূমিকা প্রসঙ্গে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘শরিয়াহ বোর্ডকে শক্তিশালী ও সাহসী ভূমিকা রাখতে হবে। বোর্ডের সদস্যদের চাকরির ভয় করলে চলবে না।’

‘বাংলাদেশে আর কোনো আর্থিক লুটতন্ত্র ফেরত আসতে দেওয়া হবে না। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি একাডেমিশিয়ানসহ সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশ্বে ইসলামি ব্যাংকখাতকে উদাহরণ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও শক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেন গভর্নর।


আরআই/টিকে

Share this news on:

সর্বশেষ

img
১ কোটি লিটার সয়াবিন তেল কিনছে সরকার, ব্যয় হবে প্রায় ১৮১ কোটি টাকা। Jan 13, 2026
img
নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে বিটিভিতে বিশেষ অনুষ্ঠান ‘প্রথম ভোট’ Jan 13, 2026
img
ঢাকায় চীনা নাগরিকসহ টেলিগ্রাম প্রতারক চক্রের ৮ সদস্য গ্রেপ্তার Jan 13, 2026
img
এলপিজি সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে: অর্থ উপদেষ্টা Jan 13, 2026
img
দুপক্ষের সংঘর্ষে রণক্ষেত্র ফরিদপুর, আহত ২৫ Jan 13, 2026
img
মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় এখনও মাসেল পাওয়ার ও ব্যবসায়ী অগ্রাধিকার পাচ্ছে: প্রফেসর রওনক জাহান Jan 13, 2026
img
নিখোঁজ শিশু উদ্ধারে চালু হলো ‘মুন অ্যালার্ট’ ও হেল্পলাইন ১৩২১৯ Jan 13, 2026
img
প্রবাসীদের সুসংবাদ দিলেন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল Jan 13, 2026
img
রিয়ালে তিন খেলোয়াড়ের ‘সুখ’ কেড়ে নিয়েছিলেন জাবি! Jan 13, 2026
img
‘আ.লীগ করে ভুল বুঝতে পেরেছি’ Jan 13, 2026
img
শিক্ষা শুধু চাকরির জন্য নয়, সৃজনশীল মানুষ গড়ার জন্য: প্রধান উপদেষ্টা Jan 13, 2026
img
একইদিনে নির্বাচন ও গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জের রিট কার্যতালিকা থেকে বাদ Jan 13, 2026
img
'গ্যাসের চরম সংকটেও পেট্রোবাংলা ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে আছে' Jan 13, 2026
img

ড. বদিউল আলম মজুমদার

‘মব আগেও ছিল, আমি নিজে আক্রান্ত হয়েছি- কিন্তু মিডিয়ায় গুরুত্ব পায়নি’ Jan 13, 2026
img
জাপা প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে ইসি অভিমুখে জুলাই ঐক্য Jan 13, 2026
img
মোবাইল ফোন আমদানিতে ৬০ শতাংশ শুল্ক কমিয়েছে এনবিআর Jan 13, 2026
img
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানিয়ে দ্বিতীয় ফটোকার্ড প্রকাশ Jan 13, 2026
img
তাপমাত্রা নিয়ে নতুন বার্তা দিলো আবহাওয়া অফিস Jan 13, 2026
img

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন

প্রথম ঘণ্টায় ১২ আপিল নিষ্পত্তি, ৫ জনের বাতিল Jan 13, 2026
img
‘সুযোগসন্ধানী’ বিতর্কে আলিয়া, পাশে দাঁড়ালেন অনন্যা Jan 13, 2026