আগামী নির্বাচনে কেউ কোনো ধরনের মেকানিজম করার চিন্তা করলে তারা পালাতে বাধ্য হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, জনগণ যাকে পছন্দ তাকে ভোট দেবে। কিন্তু তার পছন্দের ভোট দেওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করে দিতে হবে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে। এখন পর্যন্ত সেটি হয়নি। তবে এটা করতে হবে। কেউ যদি করতে না পারেন, তার সরে যাওয়া উচিত। যে পারবে সে এসে করবে। কিন্তু দায়িত্ব নিয়ে না করা শুধু অবহেলা নয়, এটা দায়িত্বের ভায়োলেশন।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সেলিব্রেটি হলে এক অনুষ্ঠানে জামায়াত আমির এসব কথা বলেন।
সাবেক সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে ‘ইন রিকগনিশন অফ সার্ভিস এন্ড সেক্রিফাইস : অ্যা স্যালুট টু আওয়ার ডিসটিংগুইশড ভেটেরানস’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামী।
অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা বিগত তিন-চার নির্বাচনের মতো কোনো নির্বাচন দেখতে চাই না। আমরা বোঝাপড়ার কোনো নির্বাচন একেবারেই দেখতে চাই না। বোঝাপড়া কোনো অথরিটির সঙ্গে হবে না, বোঝাপড়া হবে রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি, অন্য কারো সঙ্গে নয়। আমরা সেই নির্বাচনটা দেখতে চাচ্ছি।
তিনি বলেন, যদি আমরা, এই আমরা সবাই মিলে সচেতন দেশবাসী আমরা যদি সচেতন থাকি, আমাদের বিশ্বাস যদি কেউ কোনো ধরনের মেকানিজম করার চিন্তা মাথায় এসেও থাকে, তারা পালাতে বাধ্য হবে, ইনশাআল্লাহ।
জাতি এখন একটা ক্রস রোডে আছে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, জাতীয় জীবনে আগামী নির্বাচনের গুরুত্ব সীমাহীন। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন কোনো ফরম্যাটেই পরে না। এখন যাদের বয়স ৩৫ থেকে ৩৬ বছর, তারা জীবনে একটা ভোটও দেওয়ার সুযোগ পায়নি। জামায়াত এমন একটা নির্বাচন চায়, যেখানে প্রত্যেকটি ভোটার স্বস্তির সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে। কোনো চ্যালেঞ্জ, প্রশ্ন জাগ্রত হবে না। যদি সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য।
জামায়াত আগামী নির্বাচনকে একটা আইকনিক নির্বাচন হিসেবে দেখতে চায় উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচন বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা, নির্বাচন কমিশন যা বলেছে, সেটি শুধু কথায় নয়, কাজে দেখতে চায় জামায়াত। এজন্য প্রত্যেকটা ভোটিং বুথকে সুরক্ষিত করতে হবে। এর জন্য প্রত্যেক বুথে সিসি ক্যামেরার প্রয়োজন হবে। কিন্তু সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের এ বিষয়ে অনিচ্ছা দেখা যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এর বাইরে আরও যে পরিমাণ লুট করা হয়েছে, তার হিসাব জানা নেই। দেশ সেদিক থেকে গরিব নয়। চুরি–দুর্নীতি বন্ধ করলে দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। এখানে ৫০০ কোটি, ১০০০ কোটি টাকা লাগলেও এটা অবশ্যই করা উচিত। কারণ সুশাসনের পূর্বশর্ত হচ্ছে সুষ্ঠু ইলেকশন। সেক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বল্পতা থাকলেও এটি সেই অভাব পূরণ করে দেবে।
জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণার প্রসঙ্গ টেনে উপস্থিত সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক সদস্যদের উদ্দেশে শফিকুর রহমান বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে কোনো সিভিলিয়ানের মুখ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাটা প্রচারিত হয়নি। হয়েছে আপনাদের মুখ দিয়ে। আপনাদেরকে স্যালুট। এ বিষয়ে একবারই ইতিহাস রচনা হয়েছে। এটা অক্ষুন্ন থাকবে, যে যত চেষ্টা করুক। অনেকে এই বিষয়টাকে অগ্রাহ্য করতে চান, ম্লান করতে চান। এটা আনজাস্ট, এটা হয় না। অবশ্যই এ দায়িত্ব ছিল রাজনীতিবিদদের। তারা এ দায়িত্ব পালন করলে সেনাবাহিনীর একজন অফিসারকে এগিয়ে আসার প্রয়োজন হতো না। তারা এ দায়িত্ব পালন করেননি বলেই সেনাবাহিনীর একজন অফিসার এই মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতির জন্য তার এই অবদান কেউ অস্বীকার করলে আসলেই নিজেকে ভুলে যাওয়ার শামিল হবে।
জামায়াত আমির বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় নেতৃত্ব দানকারী জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীকে জাতির মানসপট থেকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তার স্বীকৃতিও দেওয়া হচ্ছে না। স্বাধীনতার পতাকা প্রথম উত্তোলন করেছিলেন আসম আব্দুর রব, তার নামটাও ঠিকমতো আসে না। যার যেখানে অবদান তার স্বীকৃতি না দিলে ভবিষ্যতে দেশে কোনো বীরের জন্ম হবে না। বীরদের অবশ্যই স্বীকৃতি দিতে হবে।
চব্বিশের আন্দোলনের সময়গুলোতে সেনাবাহিনীর দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে দেশ নির্ঘাত গৃহযুদ্ধ থেকে রক্ষা পেয়েছে উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, এখানে শুধু সার্ভিং অফিসার বা যারা এখন আছেন সেনাবাহিনী বা সশস্ত্র বাহিনীতে তারা নয়, যারা ইতোমধ্যে সশস্ত্র বাহিনী থেকে অবসরে গিয়েছেন অথবা জোর করে যাদেরকে অবসরে পাঠানো হয়েছে তাদের সবারই দায়িত্বপূর্ণ সাহসী ভূমিকা ছিল।’
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, আপনাদের সেই দিনের ভূমিকা জাতিকে বিশেষভাবে আলোড়িত করেছিল। রাওয়া ক্লাবে আপনাদের প্রেস কনফারেন্স এবং বিশেষ করে মিরপুর ডিওএইচএসে রিটায়ার্ড অফিসার যারা ছিলেন তাদের সাহসী ভূমিকা রাস্তা দেখানোর ভূমিকা।
সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিতের কথা বলেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, গরিবের টাকা নেই, তাই সে বিচার পাবে না, এটা হবে না। এক মুক্তিযোদ্ধার মেয়েকে তার জীবন ধ্বংস করে, ইজ্জত ধ্বংস করে তাকে হত্যায় প্ররোচিত করা হয়েছিল। সে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। সে কি আজ পর্যন্ত বিচার পেয়েছে? এই বিচার চোরাবালিতে এখনো আছে। আমরা দেখতে চাই ওই বিচারগুলো আগে হোক। আমরা দেখতে চাই না দুর্নীতির লেজ ধরে টানাটানি করা হচ্ছে। আমরা দেখতে চাই, দুর্নীতির কান ধরে টান দেওয়া হয়েছে। ডাল পাতা ধরা নয়। মূল ধরে টান মারতে হবে।
যুবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তোমরা এবার ভোট দেবে। আমরা তোমাদের ভোট পাহারা দেব। তোমরা জাতির পাহারাদার হবে।
অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা জাতিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা দিয়েছেন। এখন আপনাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। পরবর্তী প্রজন্মকে ভালো কিছু দেওয়াই সবচেয়ে জরুরি।
জামায়াত আমির বলেন, আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করছি। নিজেরা দুর্নীতি করব না, কাউকে করতেও দেব না। আমরা দুর্নীতির মূল ধরে টান দিতে চাই। তিনি বলেন, জাতি ও মানবতার জন্য লড়াই করে সিংহের মতো মৃত্যু হোক আমাদের। এ সময় তিনি শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদির আত্মত্যাগ স্মরণ করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আগস্টের ৩ ও ৪ তারিখ সবচেয়ে মজলুম দল ছিল জামায়াত। জনতার আন্দোলন দমাতে গিয়ে অতীতের মতো নোংরা উদ্যোগ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। জনগণ এই ঘোষণা মেনে নেয়নি। ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদের দোসররা ছাড়া জাতীয়তাবাদীরাও এর প্রতিবাদ করেছে। এজন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
জামায়াত আমির বলেন, আমরা সেদিন দল রক্ষার জন্য নয়, দেশ রক্ষার জন্য লড়াই করেছি। এই আন্দোলনে যদি কোনো অবদান থাকে, সেটি জাতির প্রতি উপহার-দায়িত্ব পালনের একটি স্মারক এবং আমাদের রাজনৈতিক নৈতিক দায়বদ্ধতা।
তিনি বলেন, আজ পর্যন্ত আমরা এই পরিবর্তনকে বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান- যে ভাষাতেই বলা হোক না কেন-তার ক্রেডিট দল হিসেবে দাবি করিনি। বর্তমান সরকারপ্রধান বিদেশে বসে কোনো এক ব্যক্তিকে আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বলায় প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, এই আন্দোলনে সব জনগণই মাস্টারমাইন্ড।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা কোনো শহীদকে দলীয় পরিচয় দিতে চাই না। দলীয় পরিচয় দিলে শহীদদের খাটো করা হয়। তারা এই জাতির সম্পদ। জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে যারা নেতৃত্ব দেবেন, তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে ধারণ করতে হবে। সেনাবাহিনীকে আমরা সেই জায়গায় পেয়েছি এবং তাদের নিয়ে আরও এগিয়ে যেতে চাই।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিরও জবাবদিহি থাকতে হবে। কেউ জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। এটি পারস্পরিক ভারসাম্যের বিষয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের সীমানা অক্ষুণ্ন রাখবে সেনাবাহিনী। সীমানা ঠিক থাকলে ভেতরের কার্যক্রম ঠিক থাকবে, না থাকলে সব এলোমেলো হয়ে যাবে। এই স্বীকৃতি অবশ্যই দিতে হবে।
তিনি বলেন, শাসনযন্ত্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রে যারা থাকবেন, তাদের মধ্যে পয়েন্ট টু পয়েন্ট বোঝাপড়া থাকতে হবে। সামান্য ঘাটতিতেই দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রত্যেকের নির্দিষ্ট জব ডিসক্রিপশন ও সীমা থাকতে হবে। সীমা লঙ্ঘন হলে বিপর্যয় অনিবার্য এবং সেখান থেকেই ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়। প্রত্যেক পেশাজীবী কোনো ভয়-ভীতি ছাড়াই দায়িত্ব পালন করবে- এমন বাংলাদেশ গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জামায়াতে ইসলামী।
আমিরে জামায়াত বলেন, আমরা এখন ভয়-ভীতির মধ্যে বসবাস করছি। আমরা সেনাবাহিনীকে দেখতে চাই-তারা বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে তুলে ধরবে। সেনাবাহিনীকে তার পেশাগত দায়িত্বে আরও মনোযোগী হতে হবে।
তিনি বলেন, জাতি এখন একটি ক্রস রোডে দাঁড়িয়ে। আগামী মাসের ১২ তারিখ নির্বাচন। জাতীয় জীবনে নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন কোনো ন্যূনতম ফরম্যাটেই পড়ে না। তরুণ প্রজন্মকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা আমাদের দেশকে অগ্রসর দেশ হিসেবে দেখতে চাই। পরবর্তী প্রজন্মের হাতে একটি নিরাপদ দেশ তুলে দিতে চাই। আমরা বেকারভাতা দিয়ে অলস জাতি গড়তে চাই না; তবে যারা অক্ষম, তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মেজর জেনারেল মাহবুব উল আলম, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান। স্বাগত বক্তব্য দেন জামায়াতের ঢাকা-১৬ আসনের প্রার্থী আব্দুল বাতেন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কর্নেল (অব.) মো. জাকারিয়া হোসেন। উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম, প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন প্রমুখ। এ ছাড়া, সশস্ত্র বাহিনীর সাড়ে তিনশ থেকে চারশ সাবেক সদস্য অংশ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।