নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার কারণে এবারের ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায়ও জায়গা পেল না বাংলাদেশ। মেলার আয়োজক সংস্থা ‘পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড’ বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় খোলামেলাভাবেই জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে এবং সরকারি সবুজ সংকেত না থাকায় বাংলাদেশকে এবার আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব হয়নি।
আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে সল্টলেক প্রাঙ্গণে শুরু হতে যাওয়া এই মেলায় অংশ নিচ্ছে না বাংলাদেশের কোনো প্রকাশনা সংস্থা।
বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না থাকা প্রসঙ্গে গিল্ড কর্মকর্তা ও সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘৪৯ তম কলকাতা বইমেলা আর ১০ দিনের মধ্যে শুরু হচ্ছে, যা ২২ জানুয়ারি থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এবারের মেলার ফোকাল থিম আর্জেন্টিনা এবং মেলাটির উদ্বোধন হবে ২২ তারিখে বিকেলে ৪টায়। সারা পৃথিবী থেকে মোট ২০টি দেশ এবারের মেলায় অংশগ্রহণ করছে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের পরিস্থিতি এবং অস্থিরতার কারণে কোনো সরকারি সবুজ সংকেত না পাওয়ায় একটি বেসরকারি সংগঠন হিসেবে মেলা কর্তৃপক্ষ ঝুঁকি নিতে পারছে না, যার ফলে এ বছরেও বাংলাদেশ বইমেলায় আসতে পারছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে যে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি যেভাবে এগোবে সেই অনুযায়ী ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। পরিস্থিতি ভালো হলে ভবিষ্যতে অংশগ্রহণের আশা আছে, কারণ বাংলাদেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের জন্য পাঠকরা অপেক্ষা করে থাকেন কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। আগামী বছর অর্থাৎ ৫০তম বইমেলা উপলক্ষে তারা পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়ে আশাবাদী। সহজভাবে বলতে গেলে, একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা অনেকটা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে সমুদ্রযাত্রায় বের হওয়ার মতো; পরিবেশ প্রতিকূল থাকলে এবং নিরাপত্তার সংকেত না থাকলে আয়োজকরা ঝুঁকি নিতে চান না, ঠিক যেমন বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিরতার কারণে এবারের বইমেলায় তাদের অংশগ্রহণ সম্ভব হচ্ছে না।’
আগামী ২২ জানুয়ারি বিকেলে সল্টলেকের বইমেলা প্রাঙ্গণে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ বছর বইমেলার ‘থিম কান্ট্রি’ আর্জেন্টিনা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত ও সে দেশের সাহিত্যিকদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আর্জেন্টিনার গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্কের সূত্র ধরে এই থিম নির্বাচন করা হয়েছে। ১৯২৪ সালে পেরু যাওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে আর্জেন্টিনায় অবস্থান করেছিলেন কবিগুরু। বুয়েনস আইরেসে সাহিত্যিক ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর আতিথেয়তায় তার সেই অবস্থান আজও দুই দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে স্মরণীয়।
১৯৯৬ সাল থেকে দীর্ঘ প্রায় তিন দশক নিয়মিতভাবে কলকাতা বইমেলায় অংশ নিয়ে আসছিল বাংলাদেশ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে কেন্দ্র করে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের অন্যতম প্রতীক ছিল বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন। ২০২৪ সালে সর্বশেষ অংশগ্রহণে বাংলাদেশের প্যাভিলিয়নটি ‘সেরা প্যাভিলিয়ন’-এর সম্মানও পেয়েছিল।
তবে ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দিল্লি-ঢাকা কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েন এবং নিরাপত্তা শঙ্কার অজুহাতে গত বছরের মতো এবারও বইমেলায় থাকছে না বাংলাদেশ। এতে বইপ্রেমী ও প্রকাশক মহলে হতাশা দেখা দিয়েছে এবং মেলায় একটি স্পষ্ট সাংস্কৃতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এবারের মেলায় প্রায় ১০০০টির বেশি স্টল থাকছে এবং সরাসরি ও যৌথভাবে অংশ নিচ্ছে ২০টি দেশ। তবে বাঙালির আবেগের এই মিলনমেলায় প্রতিবেশী বাংলাদেশের অনুপস্থিতি পাঠকদের জন্য বড় আক্ষেপের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবি/টিএ