ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চয়তায় ভারত-ইইউর নতুন বাণিজ্য চুক্তি

ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার বাণিজ্য চুক্তিটি যতটা আন্তঃমহাদেশীয় ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিষয়, ঠিক ততটাই ভূ-রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যেই ভারতের বৃহত্তম অংশীদার। ২০২৪ সালে দুই পক্ষের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১৪২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, যা দক্ষিণ এশীয় এই দেশটির মোট বাণিজ্যের ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে, ভারত হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের নবম বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।

এগুলো বেশ চমকপ্রদ সংখ্যা এবং শক্তিশালী সম্পর্কের প্রতিফলন। তা সত্ত্বেও, বাণিজ্য আলোচনাগুলো দীর্ঘ দুই দশক ধরে ঝুলে ছিল।

ফলে একটি প্রশ্ন জাগে, এখন কী এমন পরিবর্তন হলো? এর উত্তর নিহিত রয়েছে দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে মার্কিন প্রশাসনের অনিশ্চয়তার মধ্যে।

মার্কিন নেতা কিছু আলোচনায় শুল্ককে দরকষাকষির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তবে প্রায়ই তিনি এটি ব্যবহার করেন সেইসব দেশগুলোকে শাস্তি দিতে-যার মধ্যে মিত্ররাও রয়েছে-যারা তার বিশ্বদর্শনের সঙ্গে একমত নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ হলো দিল্লি রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধ না করায় তার 'জরিমানা' স্বরূপ।

সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু দেশও ট্রাম্পের কাছ থেকে নতুন শুল্কের হুমকির মুখে পড়েছিল। গ্রিনল্যান্ড দখল বা অধিগ্রহণের বিষয়ে ট্রাম্পের প্রস্তাব তারা গ্রহণ না করায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি সেই হুমকি প্রত্যাহার করে নিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বেশ আতঙ্কিত করে তুলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের সুরক্ষার পথ খুঁজছে কেবল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বা ভারতই নয়—বিশ্বব্যাপী অনিশ্চয়তার এই সময়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে আরও অনেক দেশই একে অপরের সাথে নতুন চুক্তি করছে বা পুরনো বিবাদ মিটিয়ে নিচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় দিল্লিতে এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পন্ন হলো।

ইইউ-ভারত এই চুক্তিটি হলো ভারতের সম্পন্ন করা সাম্প্রতিক সপ্তম বাণিজ্য চুক্তি। এর ঠিক আগেই ব্রাসেলস (ইইউ সদর দপ্তর) ২৫ বছরের দীর্ঘ আলোচনা শেষে দক্ষিণ আমেরিকার বাণিজ্যিক জোট 'মারকোসার'-এর সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানেও 'ট্রাম্প ফ্যাক্টর' আলোচনা দ্রুত শেষ করতে সাহায্য করেছে, যদিও ইউরোপে এটি এখন আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি-যিনি গত সপ্তাহে যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন-তিনিও চীন সফর শেষ করে ফিরেছেন। এই সফরের ফলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়বে, যা ট্রাম্পের ক্রোধ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং তিনি কানাডার ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নতুন হুমকি দিয়েছেন। কার্নি শীঘ্রই ভারত সফরেও আসবেন, যেখানে বাণিজ্যই হবে প্রধান আলোচ্য বিষয়। অন্যদিকে, চীনের সাথে কয়েক বছরের টানাপোড়েন কাটিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও ডজনখানেক ব্যবসায়িক প্রতিনিধি নিয়ে এ সপ্তাহেই বেইজিং সফরে যাচ্ছেন।

এই প্রেক্ষাপটে, ভারত-ইইউ বাণিজ্য চুক্তিটি-যা এখনও চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়-এক গভীর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করছে। কারণ এটি ব্রাসেলস এবং দিল্লি উভয়ের জন্যই কেবল বাণিজ্যিক সাফল্যের চেয়েও বেশি কিছু অর্জন করেছে।

এটি ট্রাম্পের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয় যে, বিশ্বশক্তিগুলো তার প্রশাসনের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য একে অপরের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার পথ খুঁজতে শুরু করেছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, 'যুক্তি দেওয়া যেতে পারে যে, ট্রাম্প ফ্যাক্টরই এই চুক্তিতে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী গতিবেগ জুগিয়েছে। কারণ ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের সেইসব আকস্মিক শুল্কের মুখে পড়েছে যা তারা কখনও কল্পনাও করেনি।'

তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পই হলেন সেই বড় কারণ যার ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারত তাদের বেশিরভাগ মতপার্থক্য কাটিয়ে উঠতে পেরেছে এবং যেসব অমীমাংসিত বিষয় তারা সমাধান করতে পারছিল না, সেগুলো ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য আপাতত স্থগিত রাখতে সক্ষম হয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন-উভয়ই মঙ্গলবারের এই চুক্তিকে 'সব চুক্তির সেরা' বলে অভিহিত করেছেন।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর মোদির পাশে দাঁড়িয়ে ফন ডার লিয়েন বলেন, 'এটি দুই দানবের গল্প-বিশ্বের দ্বিতীয় ও চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির গল্প-এমন দুই দানব যারা পারস্পরিক জয়ের ভিত্তিতে অংশীদারিত্ব বেছে নিয়েছে। এটি একটি জোরালো বার্তা, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলোর সেরা উত্তর হলো সহযোগিতা।'

তিনি আরও বলেন, 'এই শক্তিগুলোকে একত্রিত করার মাধ্যমে আমরা এমন এক সময়ে কৌশলগত নির্ভরতা কমিয়ে আনছি যখন বাণিজ্যকে ক্রমবর্ধমানভাবে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে... আমরা কেবল আমাদের অর্থনীতিকেই শক্তিশালী করছি না-বরং এই ক্রমবর্ধমান অনিশ্চিত বিশ্বে আমাদের জনগণের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করছি।'

মোদি বলেন, বিশ্বব্যবস্থা বর্তমানে 'এক মহাবিপর্যয়ের' মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এই বাণিজ্য চুক্তিটি বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে। তিনি বলেন, 'এর অর্থ হলো এটি কেবল একটি বাণিজ্য চুক্তি নয়; এটি যৌথ সমৃদ্ধির একটি নতুন রূপরেখা বা ব্লুপ্রিন্ট।'

দুই নেতা এই চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনকে বিরক্ত করতে চেয়েছিলেন কি না তা নিশ্চিত নয়, তবে তারা ঠিক সেটিই করেছেন বলে মনে হচ্ছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট রোববার এবিসি নিউজকে বলেন, দিল্লির সাথে বাণিজ্য চুক্তি করে ইইউ 'নিজেদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধে অর্থায়ন' করছে।

তিনি মূলত ভারতের রাশিয়ান অপরিশোধিত তেল কেনার বিষয়টি উল্লেখ করছিলেন। মার্কিন কর্মকর্তারা প্রায়ই বলেন, এই তেল কেনা পরোক্ষভাবে মস্কোকে ইউক্রেন যুদ্ধে অর্থায়ন করতে সাহায্য করছে। ভারত অবশ্য সব সময় এই দাবি অস্বীকার করে আসছে এবং বলেছে, রুশ তেল তাদের কোটি কোটি মানুষের জ্বালানি চাহিদা নিশ্চিত করে।

দিল্লি ও মস্কোর মধ্যকার পরীক্ষিত সম্পর্কই হলো প্রধান কারণ যার জন্য ভারত রাশিয়ার সাথে হুট করে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করতে অনিচ্ছুক। ভারত দীর্ঘকাল ধরে সামরিক সরঞ্জামের জন্য মস্কোর ওপর নির্ভরশীল। তবে আজকের এই চুক্তিটি ফ্রান্সের সঙ্গে ভারতের বিদ্যমান শক্তিশালী প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে, কারণ দেশটি এখন অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও তাদের প্রতিরক্ষা আমদানির ক্ষেত্রটি বহুমুখী করতে চাইছে।

ভারতের সাথে এই চুক্তি ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও আরেকটি বিশাল বাজারে প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে চীনের ওপর তাদের নির্ভরশীলতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

কুগেলম্যান আরও বলেন, 'ভারত এই অংশীদারিত্বকে বিশ্ববাণিজ্যে চীনের আধিপত্য মোকাবিলা করার একটি পথ হিসেবে দেখবে, যা তারা আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিলে করার পরিকল্পনা করেছিল। তবে এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। একইভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নও চীনকে মোকাবিলা করার নিজস্ব প্রচেষ্টায় ভারতকে একটি কার্যকর সহযোগী রাষ্ট্র হিসেবে দেখছে।'

তবে জাঁকজমকপূর্ণ সব শিরোনামের আড়ালে এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, ভারত এবং ইইউ-উভয় পক্ষেরই এখনও অনেক কাজ বাকি। যদিও চুক্তির আলোচনা শেষ হয়েছে, তবে চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে এখনও দীর্ঘ সময় লাগবে।

উভয় পক্ষের আইনি বিশেষজ্ঞরা চুক্তির চূড়ান্ত পাঠ্য তৈরি করতে কয়েক মাস সময় নেবেন। এরপর এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্ট দ্বারা অনুমোদিত হতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি খুব একটা সহজ কাজ হবে না, যেমনটি দক্ষিণ আমেরিকার বাণিজ্যিক জোট 'মারকোসার' চুক্তির ক্ষেত্রে দেখা গেছে।

ইউএস-ইন্ডিয়া স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপের বাণিজ্যের সিনিয়র উপদেষ্টা মার্ক লিনসকট লিংকডইন-এ লিখেছেন, মেধাস্বত্ব, কৃষি এবং কার্বন নিঃসরণের মতো বিষয়গুলোতে এখনও বেশ কিছু অমিল রয়ে গেছে যা মিটিয়ে ফেলতে হবে।

তবে মার্কিন শুল্কের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ইউরোপের ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এবং ভারতের শিল্পখাতগুলো উভয় দিকেই বাজারে প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধির এই চুক্তিকে ব্যাপকভাবে স্বাগত জানিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধি 'বিজনেসইউরোপ'-এর প্রেসিডেন্ট ফ্রেডরিক পারসন বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ 'প্রথম পদক্ষেপ'। তবে তিনি আরও বলেন, 'চুক্তির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য এর সঠিক বাস্তবায়নই হবে মূল চাবিকাঠি।'

পিএ/টিএ

Share this news on:

সর্বশেষ

ডিজিটাল এক্সপোতে নতুন সম্ভাবনার উন্মোচন Jan 29, 2026
শত্রুদের জন্য ‘মানসিক যন্ত্রণা’ তৈরি করতে কিমের নতুন পরিকল্পনা Jan 29, 2026
আদালত ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে: মিনেসোটার বিচারক Jan 29, 2026
১০ মিনিটে গোটা বিশ্বের সারাদিনের সর্বশেষ আলোচিত সব খবর Jan 29, 2026
সরকারি কর্মকর্তাদের ৫ বছরের বেশি চাকরি করা উচিত নয়, বললেন প্রধান উপদেষ্টা Jan 29, 2026
দারিদ্র্য থেকে ডাক্তারি যাত্রা Jan 29, 2026
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রিয় জুটি: নতুন অধ্যায় শুরু Jan 29, 2026
img
বরিশালে সেনাবাহিনীর অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র-বিস্ফোরক উদ্ধার, গ্রেপ্তার ৮ Jan 29, 2026
img
ধানের শীষের বিজয় মানে গণতন্ত্রের বিজয় : অপর্ণা রায় Jan 29, 2026
img
বিএনপির জয় নিশ্চিত বুঝেই ষড়যন্ত্র হচ্ছে : আবদুস সালাম Jan 29, 2026
img
২৯ জানুয়ারি: ইতিহাসের এই দিনে আলোচিত যত ঘটনা Jan 29, 2026
img
গত ১৭ থেকে ১৮ বছর দেশে কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়নি: আবদুস সালাম Jan 29, 2026
img
ইউরোপ চীনের সহায়তায় যুক্তরাজ্যকে আরও নিরাপদ ও ধনী করতে চাই : কিয়ার স্টারমার Jan 29, 2026
img
৫ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে স্বীকৃতি দিচ্ছে স্পেন Jan 29, 2026
img
ড্র করে প্লে-অফ নিশ্চিত করল পিএসজি ও নিউক্যাসল Jan 29, 2026
img
রবীন্দ্রনাথকে শান্তির নোবেল, বিজেপি নেতার বক্তব্যে বিতর্ক Jan 29, 2026
img
রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে প্লে-অফে জায়গা করে নিল বেনফিকা Jan 29, 2026
img
ট্রাম্প প্রশাসনের অনিশ্চয়তায় ভারত-ইইউর নতুন বাণিজ্য চুক্তি Jan 29, 2026
img
বাঁশের লাঠি নিয়ে ভোটকেন্দ্রে অবস্থান করার আহ্বান খেলাফত মজলিসের নেতার Jan 29, 2026
img
ঘুরে দাঁড়িয়ে চ‍্যাম্পিয়ন্স লিগের সেরা আটে বার্সেলোনা Jan 29, 2026