© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

চরমোনাই পীরের তিন ভাইয়ের শোচনীয় পরাজয়

শেয়ার করুন:
চরমোনাই পীরের তিন ভাইয়ের শোচনীয় পরাজয়

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৫:৪৬ পিএম | ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
নিজে প্রার্থী নন। তবু নির্বাচনের মাঠে তাঁর উপস্থিতি ছিল সর্বত্র। মঞ্চে, মিছিলে, গণসংযোগে। চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করী‌মের কণ্ঠ শোনা গেছে দেশের নানা প্রান্তে।
প্রতি‌দিনই তার উপ‌স্থি‌তি ছিল গণমাধ‌্যমে।

চর‌মোনাই পী‌রের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এ নির্বাচনে সারা‌ দে‌শে ২৫৩ জন প্রার্থী দেয়। হাতপাখার প্রার্থী থে‌কে দলীয় কর্মীদের চোখে ছিল প্রত্যাশা। জুলাই আন্দোলন-পরব‌র্তী আওয়ামী লী‌গের অনুপ‌স্থি‌তি‌তে অনু‌ষ্ঠিত এ নির্বাচ‌নে রাজনৈতিক মানচিত্রে কিছুটা বদল আসবে বলে আশা ছিল তাদের।

হাতপাখার ২৫৩‌টি আস‌নের ম‌ধ্যে বরগুনা-১ আসনে সেই প্রত‌্যাশার আংশিক ছাপ প‌ড়ে‌ছিল। সেখানে হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী অলি উল্লাহ জয় পেয়েছেন। ইসলামী আন্দোলনের সংসদীয় রাজনীতিতে এটি প্রথম উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

কিন্তু এই একক জয় চরমোনাই পরিবারের নির্বাচনী বাস্তবতা বদলায়নি।

কারণ, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পীরের তিন ভাই চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও কেউ জিততে পারেননি। বরং এক ভাইয়ের ক্ষেত্রে জামানত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।

পরিবারই সংগঠনের কেন্দ্র
ইসলামী আন্দোলনের রাজনীতিতে চরমোনাই পরিবার প্রান্তিক নয়, কেন্দ্রীয়। সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, ধর্মীয় নেতৃত্ব ও স্থানীয় সরকার সবখানেই এই পরিবারের প্রভাব দীর্ঘদিনের।
চরমোনাই পীর নিজে ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে চরমোনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।

পরে সেই দায়িত্ব নেন ভাই সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের। তিনিও দুই মেয়াদে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পীরের আরেক ভাই সৈয়দ মুহাম্মদ জিয়াউল করিম।

এই পরিবারের চার ভাই সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের, সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম, সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী এবং সৈয়দ মুহাম্মদ নুরুল করিম। বিভিন্ন সময়ে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছেন। কিন্তু সংসদে পৌঁছানো হয়নি কারো।

কে কোথায় হেরেছেন
বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ-কাজিরহাট) আসনে প্রার্থী ছিলেন সৈয়দ ইছহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের। তিনি ইসলামী আন্দোলনের সহকারী মহাসচিব এবং বাংলাদেশ কুরআন শিক্ষা বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান।

প্রাপ্ত ফল অনুযায়ী তিনি পেয়েছেন ৩৬ হাজার ৭৫৩ ভোট। একই আসনে বিএনপির প্রার্থী রাজীব আহসান পেয়েছেন এক লাখ ২৮ হাজার ৩২২ এবং জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৬৮৪ ভোট। চরমোনাই পরিবারের প্রার্থী এখানে স্পষ্টভাবে তৃতীয় শক্তি।

আবুল খা‌য়ের সামা‌জিক যোগা‌যোগ মাধ‌্যমে লে‌খেন, ‘ভোটের ফল প্রত্যাশা অনুযায়ী আসেনি। তবু এটা ব্যর্থতা নয়। আমাদের পরিশ্রম আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, তাই বৃথা যায়নি। ধৈর্য ধরে একসাথে থাকব, আরো শক্ত হয়ে ফিরে আসব, ইনশাআল্লাহ।’

একটি‌তে তৃতীয়, অপর‌টি‌তে দ্বিতীয়
বরিশাল-৫ (বরিশাল সি‌টি-সদর) ও বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে প্রার্থী ছিলেন ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম। বরিশাল-৫ আসনে তিনি পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫২৮ ভোট। অন্যদিকে, এক লাখ ৩১ হাজার ৪৩১ ভোট পেয়ে আসনটিতে জয় পেয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার।

বরিশাল-৬ আসনে ফয়জুল ক‌রি‌মের পরিস্থিতি আরো দুর্বল। এখানে বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন খান ৮১ হাজার ৮৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী মো. মাহমুদুন্নবী পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৫৩৩ ভোট। আর হাতপাখা প্রতীকের ফয়জুল করিম পেয়েছেন মাত্র ২৮ হাজার ৮২৩ ভোট।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া স্ট্যাটাসে নিজের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা তুলে ধরে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ফয়জুল করিম। স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন ‘৯৫ হাজার ৪৪ ভোট। আপনাদের প্রতি আমরা চিরকৃতজ্ঞ!’

ঢাকায় ভরাডুবি
ঢাকা-৪ আসনে প্রার্থী ছিলেন মাওলানা সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ, যি‌নি আল মাদানী না‌মে প‌রি‌চিত। তিনি ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং চরমোনাই আহছানাবাদ রশীদিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ।

এই আসনে মোট ভোটের মধ্যে পড়েছিল ৪৫ শতাংশ। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীন জয়ী হন। হাতপাখা প্রতীকে মোসাদ্দেক বিল্লাহ পেয়েছেন মাত্র ছয় হাজার ৫১৮ ভোট। জামানতও রক্ষা হয়নি।

প্রভাব আছে, ভোট নেই
চরমোনাই পরিবার ইসলামী আন্দোলনের রাজনীতিতে একটি বলয়। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কেন্দ্রীয় কমিটি, প্রায় সর্বত্র তাঁদের উপস্থিতি।
দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় শিক্ষা, ওয়াজ মাহফিল আর সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে একটি সামাজিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সংসদীয় রাজনীতি আলাদা খেলা। এখানে অনুসারী যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন বিস্তৃত ভোটব্যাংক।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সংগঠন সুজনুএর সম্পাদক রফিকুল আলমের মতে, চরমোনাই দরবারের প্রভাব প্রশ্নাতীত। নিজ ইউনিয়নে কর্তৃত্বও স্পষ্ট। কিন্তু সংসদীয় নির্বাচনে ভিন্ন সমীকরণ কাজ করে।

রফিকুল আলমের বিশ্লেষণে তিনটি বিষয় সামনে আসে। এক, ইসলামী আন্দোলনের ভোটব্যাংক এখনো সীমিত। দুই, বিএনপি ও জামায়াতের শক্ত প্রতিযোগিতায় হাতপাখা মাঝামাঝি আটকে যায়। তিন, তরুণ ও শহুরে ভোটারদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও আবেগী সংযোগ গড়ে ওঠেনি।

এসএন 

মন্তব্য করুন