চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা গুটিয়ে নেব: ডিসিসিআই
ছবি: সংগৃহীত
০৩:০৪ পিএম | ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যবসা পরিচালনার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি এমন মন্তব্য করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) জানিয়েছে, চাঁদাবাজি বন্ধ করা না গেলে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবেন। নবগঠিত সরকারের কাছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, রাজস্বব্যবস্থার সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
আজ রবিবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বারের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নবগঠিত সরকারের নিকট ডিসিসিআই-এর প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ এসব কথা বলেন।
তাসকিন আহমেদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চাঁদাবাজি ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
চাঁদাবাজিকে শক্ত হাতে দমন করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে না। প্রয়োজনে চাঁদাবাজদের শনাক্ত করতে সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে প্রস্তুত রয়েছে ব্যবসায়ী সমাজ।
তিনি বলেন, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক অর্থ দিতে হচ্ছে। পুলিশ, সিটি করপোরেশন, আয়কর দপ্তরসহ বিভিন্ন জায়গায় চাঁদা দিতে হয়। এতে ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারি খাতে দুর্নীতি বন্ধের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। তাসকিন আহমেদ বলেন, দুর্নীতি একদিনের জন্যও কমেনি। সরকারি খাতে স্বচ্ছতা না থাকায় কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ছে না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, এনবিআরকে পৃথকীকরণ এবং দ্রুত অটোমেশন করতে হবে। কার্যকর উদ্যোগ নিলে আট মাসের মধ্যেই অটোমেশন সম্পন্ন করা সম্ভব। কর কাঠামো সহজ করতে টার্নওভার কর ০.৬ শতাংশ নির্ধারণেরও দাবি জানান তিনি।
ব্যাংক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাগজপত্র ও জটিল প্রক্রিয়া ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিনিয়োগ সহজ করতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ব্যবস্থা কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়।
শ্রমবাজার পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, দেশে প্রায় ২৬ লাখ মানুষ বেকার রয়েছে। কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, বেসরকারি খাত চাঙ্গা করা গেলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং চাঁদাবাজির প্রবণতাও কমে আসবে।
সংবাদ সম্মেলনে এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়। তাদের মতে, এ উদ্যোগ না হলে প্রায় ২ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি কমে যেত, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশের সমান। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং কোভিড-১৯ মহামারির কারণে দেশের অর্থনীতি পিছিয়ে পড়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কসংক্রান্ত চুক্তি প্রসঙ্গে ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, চুক্তিটি দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই করা হয়েছিল।
আদালতের রায়ের পর চুক্তিটি অবৈধ হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উভয় দেশের জন্য ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে হলে নতুন করে কৌশলগত দরকষাকষি প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তিতে তুলা ব্যবহারের ভিত্তিতে শূন্য শুল্ক সুবিধার কথা বলা হলেও কত শতাংশ স্থানীয় তুলা ব্যবহার করতে হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি।
ডিসিসিআই চারটি অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করেছে; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, চাঁদাবাজি দমন, সরকারি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগবান্ধব আর্থিক নীতি প্রণয়ন। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত নয় এমন ঋণখেলাপিদের পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে ব্যবসায় ফিরিয়ে আনা এবং ঋণের সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে রাখার সুপারিশ করা হয়।
প্রশ্নোত্তর পর্বে তাসকিন আহমেদ বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০ দিনে তাদের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। ব্যবসায়ী সমাজ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে না; বরং বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের প্রস্তাব দিচ্ছে।
পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে করা একটি বাণিজ্য চুক্তি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো চুক্তি হয়ে থাকলে তা পুনর্বিবেচনা করা উচিত এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
কেএন/টিকে