নির্বাচনে ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছিল বড় ব্যর্থতা : সুজন
ছবি: সংগৃহীত
০২:৪৬ পিএম | ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬-এর সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে সুশাসন জন্য নাগরিক (সুজন)। সুজন মনে করে, এবারের নির্বাচনে ঋণখেলাপি এবং দ্বৈত নাগরিকদের অবাধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারা ছিল সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সুজনের জাতীয় কমিটির সদস্য একরাম হোসেন মাঠ পর্যায়ের ৯২টি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৈরি করা একটি পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট উপস্থাপন করেন।
একরাম হোসেন তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, আরপিওর বিধান মেনে কোনো রাজনৈতিক দলই তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতে প্যানেল তৈরি করেনি। বিশেষ করে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিলের ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর না মেলার বিষয়টি ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এছাড়া নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মনোনয়ন না পেয়ে যারা স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের ওপর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের জন্য ব্যাপক দলীয় চাপ ছিল। তবে চাপ সত্ত্বেও ৭৮ জন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি এবং পরে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
আচরণবিধি লঙ্ঘন ও সহিংসতা
নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপক আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতীক বরাদ্দের আগেই প্রচারণা চালানো, প্রতিপক্ষকে হুমকি দেওয়া এবং পেশিশক্তির ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো। নির্বাচনের আগে ফরিদপুর, পঞ্চগড়, মাদারীপুর ও গাজীপুরে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এমনকি খাগড়াছড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ এবং ফরিদপুরে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারের মতো উদ্বেগজনক ঘটনাও পরিলক্ষিত হয়েছে।
এছাড়া নির্বাচনী সহিংসতায় ঝিনাইগাতী ও শ্রীবর্দীতে নিহতের ঘটনা ঘটেছে। ভোটের দিন খুলনা-২ আসনে একজন ভোটার মারা যান এবং মেহেরপুর-২ আসনে অন্তত ১৫ জন আহত হন।
ভোটের দিনের চিত্র ও অনিয়ম তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটের দিন চুয়াডাঙ্গা-১ ও ২, কুষ্টিয়া-৩ এবং পঞ্চগড়-১ সহ কয়েকটি আসনে অনেক প্রার্থীর পোলিং এজেন্টের উপস্থিতি ছিল না। একরাম হোসেন জানান, চুয়াডাঙ্গা ও পঞ্চগড়ে ধর্মীয় শপথের মাধ্যমে ভোট দেওয়ায় বাধ্য করা এবং গোপন বুথে প্রবেশের অভিযোগ ভোটারের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। এছাড়া ভোলা-১ ও ঝালকাঠি-১ আসনে ফলাফল পরিবর্তন এবং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে।
ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যু
সুজনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, এবারের নির্বাচনে প্রায় দুই ডজন অভিযুক্ত ঋণখেলাপি এবং বেশ কয়েকজন দ্বৈত নাগরিক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। অন্তত ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থী উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন, যাদের মধ্যে ৪১ জন বিএনপির এবং ৪ জন জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন। এদের মধ্যে ১১ জন ঋণখেলাপি প্রার্থী নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। সুজন বলছে, তদন্ত সম্পন্ন না করেই নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশ করেছে।
গণভোট ২০২৬-এর ফলাফল
নির্বাচনের একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৬০.২৬ শতাংশ। গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২০টি (৬২.০৩%) এবং 'না' ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি (২৮.৪১ শতাংশ)। তবে গণভোটে বাতিলকৃত ভোটের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৪ লাখ। সুজন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫৯.৪৪ শতাংশ। ১৯৭৯ সালের পর এই নির্বাচনেই সর্বাধিকসংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।
একরাম হোসেন বলেন, নির্বাচনে জয়ী দলের নেতা কর্তৃক পরাজিত প্রার্থীর সাথে সাক্ষাৎ এবং পরাজিত পক্ষ কর্তৃক অভিনন্দন জানানো একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার পূর্বাভাস। তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ নতুন শঙ্কার জন্ম দিচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সুজন আশা প্রকাশ করে যে, নির্বাচন কমিশন ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করবে এবং আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করবে।
আরআই/ এসএন