© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

উত্তর কোরিয়ার ‘টপ সিক্রেট লিগ’, রহস্যের জালে ঘেরা ফুটবল

শেয়ার করুন:
উত্তর কোরিয়ার ‘টপ সিক্রেট লিগ’, রহস্যের জালে ঘেরা ফুটবল

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
১২:৫৩ পিএম | ০৯ মার্চ, ২০২৬
উত্তর কোরিয়াকে বলা হয়ে থাকে এক পৃথিবীর ভেতরে আরেক পৃথিবী, যারা নিজেদেরকে একেবারে আলাদা করে রাখে। তবুও ভূরাজনীতিতে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি এই দেশটি। উত্তর কোরিয়ার ভেতরে কী হচ্ছে, তা জানা খুবই চ্যালেঞ্জিং। অথচ এই দেশের নারী ফুটবল দল এএফসি এশিয়ান কাপে দাপট দেখিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে। গোলপোস্ট অক্ষত রেখে উজবেকিস্তান ও বাংলাদেশকে যথাক্রমে ৩ ও ৫ গোল দিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার মেয়েদের আধিপত্য নজর কাড়ার পর দেশটির ফুটবল কাঠামো নিয়ে কৌতূহল বেড়েছে। এরই প্রেক্ষিতে দ্য সুইপার পডকাস্ট একটি প্রতিবেদন করেছে। যেখানে তুলে ধরা হয়েছে- কতটা গোপনীয়তা মেনে এই দেশে ফুটবল পরিচালিত হয়।

উত্তর কোরিয়ার প্রিমিয়ার লিগে কোন ফুটবল ম্যাচ কখন হবে, স্থানীয় ভক্তরা সেটা কেবল ম্যাচের আগের দিন জানতে পারে। স্টেডিয়ামের বাইরে তা ঘোষণা করা হয়, পরের দিন কোন ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। বিদেশের দর্শকদের জন্য এই লিগের ম্যাচের ফলাফল বের করা আরও বেশি কঠিন। এই যুগে এসেও সেখানকার ঘরোয়া খেলাগুলো লাইভ স্কোর অ্যাপে দেখা যায় না। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কিছু দেশ ও ইরিত্রিয়ার পাশাপাশি উত্তর কোরিয়াই একমাত্র ফিফা সদস্যভুক্ত দেশ যাদের ঘরোয়া খেলাগুলো লাইভ স্কোর অ্যাপে দেওয়া হয় না। আর ফলাফলগুলো বাইরের বিশ্বেও পৌঁছায় অনেক বিধিনিষেধ মেনে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পুরো মৌসুম জুড়ে সময় সময় সংক্ষিপ্ত আপডেট প্রকাশ করে।



তারপরও এই নির্জন রাজ্যে খেলাধুলা কীভাবে হয় তার একটি চিত্র দাঁড় করানোর মতো যথেষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে পুরুষ ও নারী ফুটবল- উভয় ক্ষেত্রেই তিনটি স্তরের একটি কাঠামো রয়েছে। মৌসুম চলে ডিসেম্বর থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এবং তিনটি ধাপে বিভক্ত। ফিফার মতে, এখানকার খেলোয়াড়রা অপেশাদার। তবে তারা যে সংস্থার প্রতিনিধিত্ব করেন, তারা সেখানকার বেতনভুক্ত কর্মচারী হওয়ায় তারা ঠিক আক্ষরিক অর্থে অপেশাদার নন।

দেশটির সবচেয়ে সফল ক্লাব এপ্রিল ২৫ স্পোর্টস ক্লাব, যা ৪.২৫ নামে পরিচিত। উত্তর কোরিয়ার বিপ্লবী সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠা দিবসের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। রেকর্ড ও বর্তমান চ্যাম্পিয়ন উভয়ই তারা। মোট ২২টি শিরোপা জিতেছে তারা। এমনকি ২০১৯ সালে এশিয়ার তৎকালীন দ্বিতীয় স্তরের ক্লাব প্রতিযোগিতা এএফসি কাপে রানার্স-আপ হয়েছিল। ১২ দলের শীর্ষ লিগের অন্যান্য ক্লাবগুলো মূলত পিয়ংইয়ংয়ে অবস্থিত, বিভিন্ন শিল্পকারখানা, ফ্যাক্টরি বা সরকারি দপ্তরের সাথে যুক্ত সেগুলো।

উত্তর কোরিয়ার বেশিরভাগ ম্যাচ রাজধানীতেই অনুষ্ঠিত হয়। রুংরাডো ১ মে স্টেডিয়ামে, যেটা ফুটবলের জন্য নির্ধারিত বিশ্বের বৃহত্তম স্টেডিয়াম। রুংরাডো ১লা মে স্টেডিয়ামটি পিয়ংইয়ংয়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত তায়েদং নদীর একটি দ্বীপে অবস্থিত এবং এর ধারণক্ষমতা ১,১৪,০০০- যা দেখতে অনেকটা ভিনগ্রহী মহাকাশযানের মতো।

ফুটবল পর্যটনের জন্য এটি একটি দুর্ভেদ্য দেশ। বিদেশি পর্যটকদের ম্যাচের সময় আলাদা করে রাখা হয় যাতে তারা স্থানীয়দের সংস্পর্শে না আসে এবং স্থানীয় গাইডরা তাদের চোখে চোখে রাখেন। গাইডদের ঠিক গাইড না বলে পাহারাদার বলাই ভালো।

উত্তর কোরিয়ান প্রিমিয়ার লিগ দেখার একমাত্র উপায় হলো সশরীরে স্টেডিয়ামে আসা। বর্তমানে ঘরোয়া লিগের স্থানীয় কভারেজ মূলত পুরো ম্যাচের পরিবর্তে সংকলন বা হাইলাইটস এর মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রকৃতপক্ষে, বেশিরভাগ উত্তর কোরিয়াবাসীর কাছে তাদের নিজেদের স্থানীয় খেলার চেয়ে প্রধান ইউরোপীয় লিগ ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার টেলিভিশনে প্রবেশাধিকার বেশি। প্রায় সব কভারেজই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের- তবে বিশ্বের বাকি অংশের তুলনায় সেখানে এই লিগ দেখার অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন।

ম্যাচগুলো সরাসরি সম্প্রচার করা হয় না, বরং দীর্ঘদিন পর- কখনও কখনও পুরো এক বছর পর্যন্ত দেরি হয়- এবং বেশ কয়েকবার সেগুলো পুনঃপ্রচার করা হয়। এছাড়া ৯০ মিনিটের ম্যাচগুলোকে কেটে প্রায় এক ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হয়। খেয়ালখুশিমতো কাটা হয় বলে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো বাদ পড়ে যায়। স্টেডিয়ামে দৃশ্যমান সমস্ত ইংরেজি লেখা কোরীয় গ্রাফিক্স দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। আর যদি কোনো দলে দক্ষিণ কোরিয়ার খেলোয়াড় থাকে- যেমন টটেনহ্যামের সাবেক খেলোয়াড় সন হিউং মিন, যিনি টটেনহ্যামে খেলতেন- ধরে নেওয়া যায় তাকে দেখানো হবে না, এমনকি তার ম্যাচও না। যদিও এই তারকা এখন মেজর লিগ সকার ক্লাবে চলে গেছেন।

উত্তর কোরিয়ায় ফুটবল ম্যাচে সংক্ষিপ্ত ও ব্যাপকভাবে সম্পাদিত কভারেজের ব্যাপারটি এসেছে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের দুঃসহ অভিজ্ঞতা থেকে। তাদের উদ্বোধনী ম্যাচে ব্রাজিলের কাছে ৩-১ ব্যবধানে হারলেও প্রাণবন্ত এবং সুশৃঙ্খল পারফরম্যান্সের পর কর্তৃপক্ষ তাদের পরের ম্যাচটি সরাসরি সম্প্রচার করার অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু পর্তুগালের কাছে ৭-০ ব্যবধানে বিশাল পরাজয় দ্রুতই সরাসরি আন্তর্জাতিক ফুটবল দেখানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। তারপর থেকে উত্তর কোরিয়া আর কখনো ছেলেদের বিশ্বকাপ সম্প্রচার করেনি।

উত্তর কোরিয়ার নারী দলও দীর্ঘ প্রতীক্ষার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তারা সর্বশেষ ২০১১ সালে জার্মানিতে বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল। এরপর ড্রাগ টেস্টে পজিটিভ হওয়ার কারণে তাদের ২০১৫ বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। ২০১৯ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে গোল ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ হারায় এবং কোভিড বিধিনিষেধের কারণে ২০২৩ সালে অংশ নেয়নি।

এখন উত্তর কোরিয়ার নারীদের সামনে ২০২৭ সালে ব্রাজিলের বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ এসেছে।  যদিও তারা তিনবার এএফসি উইমেন’স এশিয়ান কাপ জিতেছে- সবশেষ ২০০৮ সালে। উত্তর কোরিয়ার মেয়েরা বর্তমান অনূর্ধ্ব-১৭ এবং অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ী। এই সাফল্য কিছু অদ্ভুত ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম দিয়েছে। যেমন তাদের খেলোয়াড়রা বয়স নিয়ে মিথ্যা বলছে অথবা তারা আসলে ছেলে! এমন ভাবনার আসল কারণ সম্ভবত, তাদের পিয়ংইয়ং ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল স্কুলে রাখা হয় এবং ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে তাদের একসাথে গড়ে তোলা হয়।

আরআই/টিকে

মন্তব্য করুন