তিব্বত: পৃথিবীর ছাদে ইসলামের পদচিহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
০৫:৪৫ পিএম | ২০ মার্চ, ২০২৬
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪,০০০ ফুট উচ্চতায় হিমালয়ের চূড়ায় অবস্থিত তিব্বতকে বলা হয় 'পৃথিবীর ছাদ'। এখানকার প্রকৃতি অত্যন্ত রুক্ষ ও চরম—শীতকালে তাপমাত্রা মাইনাস ৩০ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়। উচ্চতার কারণে হাল্কা বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ সমতলের তুলনায় প্রায় অর্ধেক থাকে। এই দুর্গম ভূখণ্ডটি মূলত বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। পোটালা প্রাসাদ, তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের তন্ত্রসাধনা, দালাই লামার ঐতিহ্য—এসবই তিব্বতের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিন্তু এই বৌদ্ধ প্রধান অঞ্চলে কি ইসলামের কোনো অস্তিত্ব আছে? প্রশ্নটি শুনতে অনেকের কাছেই অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। অথচ ধর্মীয় ইতিহাসের গভীরে তাকালে দেখা যায়, গত প্রায় ১২০০ বছর ধরে এই 'পৃথিবীর ছাদে' ইসলামের এক সমৃদ্ধ ও বিস্মৃত ইতিহাস শত প্রান্তিকতার মধ্যেও টিকে আছে। তিব্বতের মুসলমানরা ইতিহাসের স্রোতে অনেকটাই উপেক্ষিত। কিন্তু তাদের অস্তিত্ব ও ঐতিহ্যগত উপস্থিতি ইসলামের বৈশ্বিক প্রসারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
প্রসঙ্গত, মুসলিমরা তিব্বতের একটি ছোট কিন্তু সুপ্রতিষ্ঠিত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, যারা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২–৩%। তাদের শিকড় ১৪শ থেকে ১৭শ শতাব্দীতে কাশ্মীরি, লাদাখি এবং চীনা অভিবাসীদের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। লাসা, শিগাৎসে এবং ত্সেতাং-এ তাদের বসতি রয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়টি স্থানীয় সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তাদের একজন বিখ্যাত পণ্ডিত “কাচে ফালু” (Kache Phalu) নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। ধর্মীয়ভাবে আলাদা হলেও সাংস্কৃতিকভাবে তারা তিব্বতি বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রায় অবিচ্ছিন্নভাবে মিশে আছে। তবে, ১৯৫৯-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক তিব্বতি মুসলমান নানা সমস্যার সম্মুখীন হন। তাদের অধিকাংশকে বংশগত কারণে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং তারা ভারতের শ্রীনগরে ঠেলে দেওয়া হয়।
আগমনের পথ ও প্রেক্ষাপট
তিব্বতে ইসলামের আগমন ঘটেছিল শান্তিপূর্ণভাবে, ধীর লয়ে এবং বৈপ্লবাত্মক পন্থার বদলে বিবর্তনের পথে। মূলত যোগাযোগ ও বাণিজ্যের হাত ধরে ইসলাম পৌঁছে বিশ্বের শীর্ষতম শিখরে। অষ্টম থেকে নবম শতাব্দীতে আব্বাসীয় খিলাফতের স্বর্ণযুগে ইসলামী সভ্যতা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সভ্যতায় পরিণত হয়েছিল। তখন ঐতিহাসিক সিল্ক রোড বরাবর ব্যাপক বাণিজ্যিক যোগাযোগ গড়ে ওঠে বিশ্বব্যাপী। পারস্য, বুখারা, সমরকন্দ, কাশ্মীর এবং লাদাখ থেকে মুসলিম বণিকরা বিপজ্জনক হিমালয় পাড়ি দিয়ে তিব্বতে আসতে শুরু করেন।
এই বণিকরা শুধু পণ্যই নিয়ে আসেননি—তারা সাথে করে এনেছিলেন ইসলামের নৈতিক শিক্ষা ও উন্নত চরিত্র তথা ঈমানের আলোকশিখা। তিব্বতি ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ আছে, স্থানীয়রা যখন দেখল এই আগন্তুক বণিকরা সততার সাথে ব্যবসা করে, ওজনে কম দেয় না, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল, তখন তারা এই নতুন ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করে।
একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে কাশ্মীর ও মধ্য এশিয়া থেকে আগত সুফি সাধকরা তিব্বতে ইসলাম প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তারা স্থানীয় ভাষা তিব্বতি শিখে সাধারণ মানুষের মাঝে মিশে যান এবং ইসলামের সহজ-সরল বাণী পৌঁছে দেন। সুফিবাদের আধ্যাত্মিক দিক এবং তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের তন্ত্রসাধনার মধ্যে কিছু সাদৃশ্য স্থানীয়দের কাছে ইসলামকে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
লাসা গ্র্যান্ড মসজিদ-ইসলামের নীরব সাক্ষী
তিব্বতে ইসলামের উপস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো রাজধানী লাসায় অবস্থিত 'লাসা গ্র্যান্ড মসজিদ', যা স্থানীয়ভাবে 'মসজিদ হাবালিন' নামেও পরিচিত। ১৭১৬ সালে নির্মিত এই মসজিদটি বিশ্বের অন্যতম উচ্চতম স্থানে অবস্থিত মসজিদ।
এই মসজিদের স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে এতে রয়েছে চীনা শিল্পকলার প্রভাব—উঁচু নকশাদার ছাদ, রঙিন কাঠের কাজ, ঐতিহ্যবাহী চীনা নকশা। অন্যদিকে রয়েছে ইসলামী স্থাপত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ মেহরাব, যা কিবলা তথা মক্কার দিক নির্দেশ করে। এই দুই সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয় যেন তিব্বতি মুসলমানদের বহুমাত্রিক পরিচয়ের প্রতীক—তারা তিব্বতের মাটিতে শেকড় গেড়েছে, কিন্তু তাদের ধর্মীয় পরিচয় তারা অটুট রেখেছে।
মসজিদটি শুধু ইবাদতের স্থান নয়, এটি তিব্বতি মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এখানে তারা ঈদের নামাজ আদায় করেন, বিবাহ-শাদির অনুষ্ঠান পালন করেন এবং শিশুদের কুরআন শিক্ষা দেন।
উল্লেখ্য, লাসায় তাদের সবচেয়ে বড় বসতি রয়েছে, যেখানে মোট চারটি মসজিদ রয়েছে—এর মধ্যে ১৭১৬ সালে নির্মিত বড়া মসজিদ (Bada Masjid) উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও শিগাৎসেতেও তাদের উপস্থিতি রয়েছে।
সংস্কৃতির সংমিশ্রণ-তিব্বতি মুসলিম জীবনধারা
তিব্বতি মুসলমানদের জীবনধারা এক অনন্য সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের উদাহরণ। ভাষার দিক থেকে তারা তিব্বতি, ম্যান্ডারিন চীনা, উর্দু বা কাশ্মীরি ভাষায় কথা বলেন। পোশাকের দিক থেকে তারা স্থানীয় তিব্বতি পোশাক পরেন। খাদ্যাভ্যাসেও স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাব স্পষ্ট। তবে তা সর্বাবস্থায় হালাল হয়ে থাকে।
তারা ইয়াকের মাংস খান, যা তিব্বতের ঐতিহ্যবাহী খাদ্য। তাদের প্রিয় খাবারের তালিকায় রয়েছে মোমো (মাংসের ডাম্পলিং), থুকপা (নুডল সুপ) এবং গরম মাখন চা। কিন্তু এই খাবারগুলো তারা তৈরি করেন ইসলামী আইন অনুযায়ী হালাল পদ্ধতিতে। পশু জবাইয়ের সময় 'বিসমিল্লাহ' বলে আল্লাহর নাম নেওয়া হয় এবং রক্ত সম্পূর্ণরূপে বের করে দেওয়া হয়।
তিব্বতে মূলত দুই ধরনের মুসলিম সম্প্রদায় বসবাস করেন। প্রথম দল হলো 'খাছি' (কাশ্মীরি) মুসলমান, যারা শত শত বছর আগে কাশ্মীর ও মধ্য এশিয়া থেকে এসেছেন। দ্বিতীয় দল হলো চীনের অন্যান্য অংশ থেকে আগত 'হুই' (Hui) মুসলমান। এই দুই সম্প্রদায় তাদের উৎস ও ঐতিহ্যে ভিন্ন হলেও ধর্মীয় বিশ্বাস ও ইবাদতের ক্ষেত্রে তারা সম্প্রতির পরশে একতাবদ্ধ।
ঈমানের দৃঢ়তা-প্রতিকূল পরিবেশে ধর্মচর্চা
তিব্বতের প্রতিকূল পরিবেশে ইসলাম পালন করা সহজ নয়। প্রচণ্ড শীত, অক্সিজেনের স্বল্পতা, বিচ্ছিন্ন ভৌগোলিক অবস্থান—এসব সত্ত্বেও তিব্বতের মুসলমানরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের ধর্মীয় কর্তব্য পালন করেন।
বিশেষ করে রমজান মাস তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন। দিনের দৈর্ঘ্য অনেক বেশি এবং প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যেও তারা রোজা রাখেন। তারাবির নামাজে তারা মসজিদে জড়ো হন এবং কুরআন তেলাওয়াত শোনেন। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহায় তারা নতুন পোশাক পরে মসজিদে যান। ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধের ঐতিহ্যে একে অপরকে আলিঙ্গন করেন এবং স্থানীয় তিব্বতি রীতিতে সাংস্কৃতিক আবহে ঈদের আনন্দ উদযাপন করেন।
তারা তাদের সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা দেওয়ার জন্য গোপনে বা প্রকাশ্যে কুরআনের ক্লাসের আয়োজন করেন। মক্তব ও মাদ্রাসায় শিশুরা আরবি বর্ণমালা শেখে, কুরআন তিলাওয়াত শেখে এবং ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো জানতে পারে।
ইতিহাসের স্রোতে-চ্যালেঞ্জ ও সংগ্রাম
তিব্বতের মুসলমানরা ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিব্বতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তাদের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। অনেকে তিব্বত ছেড়ে ভারতে, বিশেষ করে ধর্মশালা ও লাদাখে চলে যান।
তবে যারা রয়ে গেছেন, তারা নিজেদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয় ধরে রাখতে সচেষ্ট। তারা স্থানীয় বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন। দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক অনুষ্ঠান ও প্রতিবেশী সুলভ সম্পর্ক বিদ্যমান।
বিস্মৃত ইতিহাসের পুনরাবিষ্কার
তিব্বতের মুসলমানরা বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে অনেকটাই অজানা। তাদের অস্তিত্ব ইসলামের বৈশ্বিক প্রসারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তারা প্রমাণ করেছেন যে ঈমান কোনো ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং যেখানে বিশ্বাস ও আন্তরিকতা থাকে, সেখানে বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়াতেও আজানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়।
বর্তমানে তিব্বতে মুসলিম জনসংখ্যা খুব বেশি নয়-হাজার খানেকের মতো। কিন্তু তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি এই অঞ্চলের ধর্মীয় বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। 'পৃথিবীর ছাদে' ইসলামের পদচিহ্ন অনুসন্ধান করলে আমরা দেখতে পাই, ধর্ম ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণ কেমন সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারে।
তিব্বতের এই বিস্মৃত মুসলমানদের কথা বলতে গিয়ে ধর্মীয় ইতিহাসবিদ মরিস লোম্বার্ডের একটি উক্তি স্মরণযোগ্য: "ইসলামের ইতিহাস কেবল আরব বা পারস্যের ইতিহাস নয়, বরং এটি মানবসভ্যতার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ—যেখানে চীন, ভারত, আফ্রিকা এমনকি তিব্বতের মতো দুর্গম অঞ্চলও নিজেদের অবদান রেখেছে।"
তিব্বতের মুসলমানরা আজও প্রতিদিন ফজরের আজানের ধ্বনিতে তীব্র শীতের মধ্যে জাগরণ করেন, সূর্যাস্তের সময় মাগরিবের নামাজ আদায় করেন এবং রমজানে রোজা রাখেন। তাদের এই ধর্মচর্চা প্রমাণ করে যে ইসলাম কেবল মরুভূমির ধর্ম নয়, বরং এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গেও নিজের জায়গা করে নিয়েছে।
এসএন