মুসলমানদের ইরান বিজয়ের ইতিহাস
ছবি: সংগৃহীত
০৬:১৪ এএম | ২৭ মার্চ, ২০২৬
ইসলাম আগমনের সময় পৃথিবীর প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি ছিল রোম ও পারস্য। রোমানরা ছিল খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী এবং তারা ইউরোপের গ্রিক, বলকান, সিসিলি ও ইতালির একাংশ, এশিয়ার তুরস্ক, শাম ও ফিলিস্তিন অঞ্চল এবং আফ্রিকার মিসর, লিবিয়া ও উত্তর আফ্রিকার একাংশ শাসন করত। অন্যদিকে পারস্য ছিল পৌত্তলিক ও অগ্নি উপাসকদের সাম্রাজ্য। তারা আধুনিক ইরান, ইরাক, ওমান, ইয়েমেন, বাহরাইন, সিরিয়ার একাংশ, আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও পাকিস্তানের পশ্চিমাঞ্চল শাসন করত।
আধুনিক ইরান ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় অঞ্চল।
ইসলামের সূচনাকাল থেকে পারস্যের সঙ্গে মুসলমানদের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ছিল। এর প্রধান কারণ ছিল তিনটি : ১. পারসিকরা অগ্নি উপাসক ও পৌত্তলিক ছিল, যা ইসলামের একত্ববাদী বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, ২. পবিত্র কোরআনের সুরা রোমে আল্লাহ পারস্য সাম্রাজ্যের আশু পতন এবং রোমের বিজয়ের সংবাদ দিয়েছিলেন, ৩. পারস্য সম্রাট দ্বিতীয় খসরু মহানবী (সা.)-এর চিঠির মর্যাদাহানি করে এবং নবীজি (সা.) তাঁকে অভিশাপ দেন। কিন্তু মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় পারস্য বাহিনীর সঙ্গে মুসলিম বাহিনী কোনো সামরিক সংঘাতে লিপ্ত হয়নি।
আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর খেলাফতের সময়ে মুসলিম বাহিনী পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। মুসলিম শাসনাধীন হওয়ার আগে ইরান বা পারস্য ছিল সাসানীয় সাম্রাজ্যের অধীন। সাসানীয় রাজপরিবারের দ্বন্দ্ব, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংঘাতে সামরিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা তৈরি এবং নৈতিক অধঃপতনের কারণে সাসানীয় সাম্রাজ্য পর্যুদস্ত অবস্থায় পৌঁছেছিল। পাশাপাশি শাসকগোষ্ঠীর জুলুম ও অবিচারে প্রজাসাধারণও অতিষ্ঠ ছিল।
ফলে মুসলিম বাহিনী কোনো অঞ্চলে প্রবেশ করলে সাসানীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রজারাই তাদের সাহায্য করত। (ইসলাম কিউএ ডটইনফো)
পারস্য বা ইরান বিজয়ের সূচনা করেন মুসলিম সেনাপতি মুসান্না বিন হারিস (রা.)। তিনি ১৩ হিজরিতে সুওয়াদ অঞ্চলের একাংশ জয় করেন, যা আধুনিক ওমানের অংশ। আবু বকর (রা.)-এর যুগে মুসলিম বাহিনী ইরাকে বিজয় অভিযান শুরু করে, যা মূলত পারস্যের অধীনেই ছিল। এমনকি পারস্য সম্রাটের রাজধানী মাদায়েনও (তিসফুন) ইরাক অঞ্চলে ছিল।
মুসলিম সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা.)-এর নেতৃত্বে ইরাক বিজয়ের বেশির ভাগ সম্পন্ন হয়। (ইসলাম হিস্টোরি ডটকম)
পারস্য বিজয়ের মূল অভিযান শুরু হয় খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর যুগে। সেনাপতি আবু উবায়দা আস সাকাফি (রা.) পারস্যের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিজয় অভিযান শুরু করেন। এ সময় তিনি পারস্যের একাধিক বিখ্যাত সেনাপতিকে পরাজিত করেন। যাদের মধ্যে আছে সেনাপতি জাবান, সেনাপতি নরশেহ, সেনাপতি জালিয়ানুস। ১৩ হিজরিতে ঐতিহাসিক সেতুর যুদ্ধেও আবু উবায়দা সাকাফি (রা.) নেতৃত্ব দেন। কিন্তু কৌশলগত ভুলের কারণে মুসলিম বাহিনী বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয় এবং আবু উবায়দা (রা.) শহীদ হন। তাঁর পর এই যুদ্ধের নেতৃত্বে দেন মুসান্না বিন হারিস (রা.)। (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ২/৪২১)
ওমর (রা.)-এর খেলাফতের শুরুভাগে মুসলিম বাহিনীর মূল মনোযোগ ছিল শাম অঞ্চলে। কিন্তু ইরাক অঞ্চলে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা বারবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় তিনি ইরাক বিজয় সম্পন্ন করার মনস্থির করেন। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) সেনাপতি সাআদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর ওপর এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৪ হিজরিতে ঐতিহাসিক কাদেসিয়ার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলিম বাহিনীর সেনা সদস্য ছিল ৩৬ হাজার। বিপরীতে পারসিক বাহিনীর নেতৃত্ব দেন রোস্তম ফাররখজাদ। তাঁর বাহিনীর সেনা সদস্য ছিল দুই লাখের বেশি। চার দিন যুদ্ধ চলার পর পারস্য সেনাপতি রোস্তম নিহত হয় এবং মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে। এই বিজয়ের ফলে সমগ্র ইরাক মুসলমানদের অধীনে চলে আসে এবং পারস্য সাম্রাজ্যের সীমানা জাগরুস পর্বত শ্রেণিতে গিয়ে ঠেকে। মূলত কাদেসিয়ার যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে পারস্য সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে গিয়েছিল। কাদেসিয়ার যুদ্ধে ছয় শ সাহাবি ও সত্তরের অধিক বদরি সাহাবি অংশগ্রহণ করেছিলেন। (তারিখে তাবারি : ২/৩৮৪; আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৯/৬৩০)
১৬ হিজরিতে মুসলিম বাহিনী মাদায়েন বা তিসফুন জয় করে, যার অপর নাম কাতেসিফুন। মাদায়েন ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী। সাহাবি সাআদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)-এর মুসলিম বাহিনী এই শহর জয় করেন। তাঁর সঙ্গে আরো ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ, আসেম বিন আমর, কা’কা বিন আমর (রা.)-এর মতো বিখ্যাত বীর সেনাপতিরা। পারস্য সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদিগার্দ মুসলিম বাহিনী শহরে পৌঁছার আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যান। এই বিজয়ের পর পারস্য সাম্রাজ্যের কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং তা নামসর্বস্ব সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। (আল কামিল : ২/৩১১)
মুসলমানদের ইরান বিজয়ে চূড়ান্ত ও নির্ণয়ক যুদ্ধ ছিল ২১ হিজরিতে সংঘটিত নেহাবন্দের যুদ্ধ (নেহাবন্দ আধুনিক ইরানের অংশ)। রাজনৈতিক ও সামরিক গুরুত্বের কারণে এই যুদ্ধকে ‘ফাতহুল ফুতুহ’ বা বিজয়গুলোর বিজয় বলা হয়। কেননা এই নেহাবন্দের যুদ্ধের পরাজয়ের পর পারস্য সাম্রজ্যের পতন চূড়ান্ত হয়ে যায়। মুসলিম বাহিনী ইস্পাহানসহ পারস্যের প্রধান প্রধান নগরগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। অন্যদিকে পারস্য সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদিগার্দ মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করে শক্তি সঞ্চারের চেষ্টা করেন। কিন্তু শক্তি সঞ্চার তো দূরের কথা, তিনি নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেতেই ব্যর্থ হন। তাঁর একাধিক সেনাপতি স্বাধীন ও আঞ্চলিক শাসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অবশেষে ৩০ হিজরিতে মার্ভের এক কলচালকের হাতে তাঁর নির্মম মৃত্যু হয়। এভাবে পারস্য বা ইরানের বিরুদ্ধে মুসলিম বিজয় চূড়ান্ত হয়। (তারিখে তাবারি : ২/৪০২)
এসকে/টিএ