কথিত পীর হত্যা: পুলিশ থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি
ছবি: সংগৃহীত
০২:২৩ এএম | ১২ এপ্রিল, ২০২৬
কোরআন অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় একটি মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দরবারটির প্রধান কথিত পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামিম (জাহাঙ্গীর) নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহতও হয়েছেন।
শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় অবস্থিত 'শামিম বাবার দরবার শরিফ' নামে পরিচিত স্থানে ঘটনাটি ঘটে। তবে হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হয় শনিবার সকালে।
হামলার আশঙ্কায় পুলিশ আগে থেকেই উপস্থিত ছিল কথিত পীরের দরবারে। কিন্তু বিক্ষুব্ধ লোকজনের উপস্থিতি বেশি থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় পুলিশের।
নিহত ব্যক্তির নাম শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর। তিনি ফিলিপনগর গ্রামের বাসিন্দা।
পুলিশ ও স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, শামীমের আস্তানায় প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে গান-বাজনা হয়। ২০২১ সালের মে মাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় মামলা হয়।
তখন পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে তিনি আবার একই ধরনের কর্মকাণ্ড শুরু করেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
তারা দাবি করেন, তিনি পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন ওই কথিত পীর, যা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত করে।
বেশ কয়েক বছর আগের একটি ভিডিও শুক্রবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বেশ কয়েকজন ব্যক্তি বলেন, ফেসবুকে ভিডিও প্রচার হওয়ার পরে শনিবার সকালে শামীমের আস্তানা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হন।
তারা সিদ্ধান্ত নেন, দুপুরের পর আস্তানায় হামলা চালানো হবে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, খবরটি স্থানীয় প্রশাসনের কাছে চলে যায়। সে কারণে সকাল থেকে ওই আস্তানায় পুলিশও ছিল। জোহরের নামাজের পর এলাকায় বেশ কয়েকটি স্থান থেকে বিভিন্ন বয়সী লোকজন লাঠিসোঁটা, রড ও হাঁসুয়া নিয়ে আস্তানার দিকে রওনা দেয়।
এরপর সেখানে গিয়ে হামলা চালায়। আধা ঘণ্টার বেশি সময় ধরে সেখানে তাণ্ডব চালানো হয়। এতে আস্তানায় থাকা কয়েকজন আহত হন। অনেকে প্রাণ ভয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান।
পুলিশ জানায়, অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে হাজির হলেও আক্রমণকারীর সংখ্যা এতো বেশি ছিল যে, তাদের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই ব্যক্তির (শামীম) একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, তাতে ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়া রয়েছে। কিন্তু ভিডিওটি অনেক আগের।
ভিডিওটি সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকার মানুষ সেখানে হামলা চালায়। বিক্ষুব্ধ জনতার তুলনায় পুলিশ কম ছিল। এ জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ওই ব্যক্তিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।
এসপি বলেন, এলাকার পরিস্থিতি এখন শান্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কারা, কীভাবে ভিডিওটি নতুন করে সামনে আনলো, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, আস্তানার পেছন থেকেই সহস্রাধিক মানুষ এসে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। এতো মানুষের হামলা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শামীম সেখানকার ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন।
পরে ফিলিপনগর উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে এসএসসি, কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে বিকম পাস করেন। পরে রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এমকম সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে কেরানীগঞ্জ এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন শামীম। পরে চাকরি ছেড়ে কেরানীগঞ্জের এক পীরের মুরিদ হন এবং সেখানে খাদেম হিসেবে বসবাস শুরু করেন।
ওই সময় থেকে পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ২০০৭ সালে তিনি বিয়ে করলেও সেই সংসার দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
শামীম রেজা ২০১৮ সালের দিকে নিজ বাড়িতে এসে পৈত্রিক জমিতে একটি আস্তানা গড়ে তোলেন। ২০২১ সালের ১৬ মার্চ এক অনুসারীর শিশুপুত্রের লাশ ঢাকঢোল বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনায় আসেন শামীম।
পরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে তাকে দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
টিজে/টিএ