ঢাকাই সিনেমায় নারী তারকাদের প্রভাব কম কেন?
ছবি: সংগৃহীত
০১:২০ পিএম | ১২ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগে নায়িকারা ছিলেন গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। ববিতা, শাবানা, সুচন্দা প্রমুখ অভিনেত্রীদের ওপর নির্ভর করেই বহু সফল সিনেমা নির্মিত হয়েছে। তখন গল্পে নারী চরিত্র ছিল শক্তিশালী, জটিল ও বহুমাত্রিক। দর্শকরাও নায়িকাদের অভিনয় দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যেতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই ধারা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এখন ইন্ডাস্ট্রি হয়ে গেছে নায়ককেন্দ্রিক।
বর্তমানে ঢালিউডে একটি প্রচলিত ধারণা হলো ‘নায়কের নামে সিনেমা চলে।’ সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও দেখা যায়, একজন শীর্ষ নায়কের উপস্থিতিই সিনেমার বাণিজ্যিক সাফল্যের প্রধান শর্ত হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে প্রযোজক ও পরিচালকরা ঝুঁকি কমাতে নায়কনির্ভর গল্পেই বেশি বিনিয়োগ করছেন। এর ফলে নায়িকারা গল্পের কেন্দ্রে না থেকে ‘সহায়ক’ হয়ে পড়ছেন।
কেন কমেছে নায়িকাদের প্রভাব? এমন প্রশ্নের উত্তরে কয়েকটি কারণ সামনে আসে। এগুলো হলো-
* গল্পের কাঠামোতে পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গবেষণা ও বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ সিনেমার গল্প পুরুষকেন্দ্রিক। নারী চরিত্রকে দুর্বল বা নির্ভরশীলভাবে উপস্থাপন করা হয়। এ ‘মেইল গেজ’ বা পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি গল্পকে এমনভাবে নির্মাণ করে, যেখানে নায়িকা শুধু নায়কের পরিপূরক।

* প্রযোজনা ও বাজারের চাপ : সিনেমা একটি ব্যবসা। প্রযোজকরা মনে করেন, নায়ককেন্দ্রিক সিনেমা বেশি লাভজনক। ফলে তারা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসাবে নায়ককে প্রাধান্য দেন। নারীভিত্তিক গল্পকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়।
* তারকাতন্ত্রের সংকট : বর্তমানে খুব কম নায়িকা আছেন, যাদের নামেই সিনেমা ‘চলে’। যেমন-জয়া আহসান নিজস্ব অভিনয়শৈলী ও ভিন্নধর্মী কাজের মাধ্যমে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন। কিন্তু তার বাইরে এমন নায়িকার সংখ্যা খুবই সীমিত। যদিও তার নামে সিনেমা চলে এটাও নিশ্চিত করে বলা যায় না।
* পারিশ্রমিক ও বৈষম্য : নায়িকাদের পারিশ্রমিক নায়কদের তুলনায় অনেক কম, এটি দীর্ঘদিনের অভিযোগ। অভিজ্ঞ অভিনেত্রীদের মতে, একই সিনেমায় কাজ করেও নায়িকারা কম মূল্যায়িত হন। এ বৈষম্য নারীদের অবস্থান দুর্বল করে।
* কর্মপরিবেশ ও রাজনীতি : সিনেমায় নারী শিল্পীদের নানা ধরনের ‘অদৃশ্য রাজনীতি’ ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। অনেকেই অভিযোগ করেন, কাজের সুযোগ পেতে গেলে নানা চাপ ও আপস করতে হয়। এতে অনেক প্রতিভাবান অভিনেত্রী টিকে থাকতে পারেন না।
* দ্রুত তারকা হওয়ার প্রবণতা : বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রজন্মের অনেক শিল্পীর মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রবণতা বেশি, কিন্তু অভিনয়ের গভীরতা ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী নারী তারকা তৈরি হচ্ছে না।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঢালিউডে নায়িকাদের অবস্থান খুব একটা সুবিধাজনক নয়। বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও যারা কাজ করছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জয়া আহসান, বিদ্যা সিনহা মিম, নুসরাত ফারিয়া, পূজা চেরীসহ আরও কয়েকজন। টিভি নাটক থেকে আসা মেহজাবীন চৌধুরী, তাসনিয়া ফারিণ, সাবিলা নূরও ইদানীং সিনেমায় মনোযোগ দিয়েছেন। কিন্তু তাদেরও বাণিজ্যিক সিনেমায় নায়কের অংলকার হিসাবেই রাখা হচ্ছে। এক্ষেত্রে জয়া আহসান কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের কলকাতায়ও সমানভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক মানের অভিনেত্রী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তবে কিছু ওটিটি প্ল্যাটফর্মে নারীপ্রধান কনটেন্ট বাড়ছে, যেখানে নারী চরিত্রের গভীরতা বেশি। কিন্তু সেটিও এ মুহূর্তে উল্লেখ করার মতো নয়। এটাও ঠিক যে, ওটিটি যুগে গল্প বলার ধরনে পরিবর্তন এসেছে। এখানে নারী চরিত্রকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে দেখা গেছে, দর্শক, বিশেষ করে নারী দর্শক, নারীকেন্দ্রিক গল্পে আগ্রহী। বাংলাদেশেও এ প্রবণতা ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে নারী তারকাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইন্ডাস্ট্রিতে নায়কনির্ভর সিনেমা তৈরি হলেও নায়িকারাও চেষ্টা করছেন নিজেদেরে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে। তাদের সংগ্রাম শুধু অভিনয়ে সীমাবদ্ধ নয়। নিরাপত্তাহীনতা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, ব্যক্তিগত জীবনের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি, ক্যারিয়ার স্থায়িত্বের অভাব-এসব সমস্যার মধ্য দিয়েই তাদের কাজ করতে হয়। অনেক সময় তারা নিজের অবস্থান ধরে রাখতে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করেন। তাই বলে কী এ ধারার পরিবর্তন হবে না? এমন প্রশ্নও উঠে সবসময়। কীভাবে বদলানো সম্ভব? বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি সমাধানের কথা বলেন। তাদের মতে, নারীকেন্দ্রিক গল্প বাড়ানো, প্রশিক্ষণ ও অভিনয়ের মান উন্নয়ন, সমান পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি, নতুন নির্মাতাদের উৎসাহ দেওয়া হলেই শুধু নায়িকা তথা নারী অভিনেত্রীরাও নায়কদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকতে পারবেন। পুরুষতান্ত্রিক গল্প, বাজারের চাপ, বৈষম্য এবং তারকাতন্ত্রের সংকটের মাঝেও নারীদের সঙ্গে বৈষম্য নিয়ে পরিবর্তনের সম্ভাবনাও রয়েছে, বিশেষ করে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উত্থানের ফলে। এ মাধ্যমে যদি নির্মাতারা সাহস করে নারীকেন্দ্রিক গল্পে বিনিয়োগ করেন এবং শিল্পে সমতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে আবারও নায়িকারা সিনেমার কেন্দ্রে ফিরে আসতে পারেন। তখনই হয়তো ঢালিউড তার হারানো ভারসাম্য ফিরে পাবে।
কেএন/এসএন