© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

মায়া অ্যাঞ্জেলু ও রবীন্দ্রনাথ: ‘খাঁচার পাখি’ থেকে ‘বনের পাখি’তে যাত্রা

শেয়ার করুন:
মায়া অ্যাঞ্জেলু ও রবীন্দ্রনাথ: ‘খাঁচার পাখি’ থেকে ‘বনের পাখি’তে যাত্রা

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৩:০৫ পিএম | ১১ মে, ২০২৬
মার্গারিট অ্যানি জনসন ওরফে মায়া অ্যাঞ্জেলু (১৯২৮–২০১৪) ছিলেন একজন বিখ্যাত আমেরিকান কবি, স্মৃতিকথা লেখক, অভিনেত্রী ও নাগরিক অধিকারকর্মী। তিনি মূলত তার বর্ণনাত্মক আত্মজীবনী, বিশেষ করে ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত 'আই নো হোয়াই দ্য কেজড বার্ড সিংস' কবিতাটির জন্য সুপরিচিত, যা বর্ণবাদ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তার শৈশবের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এর ৯১ বছর আগে আশ্চর্যজনকভাবে ৩১ বছরের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন ‘দুই পাখি’। তবে কি বদ্ধ শৈশবের যন্ত্রণা উভয়কেই তাড়িয়ে ফিরত?

মায়া অ্যাঞ্জেলু ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুই সময়ের স্রষ্টা। শ্রেণি, জাতি, লিঙ্গ ও ভাষা– সবই তাদের আলাদা। কিন্তু তাদের জীবনের প্রারম্ভের দিনগুলোতে বদ্ধ হয়ে থাকার অভিজ্ঞতা দুজনকেই একইরকমভাবে ভাবিয়েছে। তারা আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন, আমরা যেন প্রত্যেকে ভাবি— ‘And still I rise’। জীবন যেন দিই আহূতি মুক্তি-আশে।



তিন বছরের মায়া ও তার দাদা বেইলিকে তাদের ডিভোর্সি বাবা-মা ট্রেনে বসিয়ে রওনা করে দিল একসকালবেলায় দিদার বাড়ির উদ্দেশে। দিদা একটি দোকান চালায় প্রতিবন্ধী মামাকে নিয়ে।

ছোট্ট মায়া বড় হতে থাকে মা-বাবার অমানবিকতায়। ভুগতে থাকে আত্মবিশ্বাসহীনতায়। ক্রুদ্ধ হয় ‘সাদা’ চামড়ার মানুষের বর্ণবিদ্বেষী মনোভাবে, ও দিদিমার অসহায় আপসে।

মায়ার যখন সাত বছর বয়স, তখন তার মা তাদের দুই ভাইবোনকে নিয়ে আসে নিজের কাছে। মাত্র ৮ বছর বয়সে তার মায়ের ছেলে-বন্ধু মায়াকে ধর্ষণ করে, পরে সেই ধর্ষক খুন হয়। এ অভিজ্ঞতা মায়াকে নীরব করে দেয়। সংশয় আর অপরাধবোধের খাঁচায় বন্দি হয় মায়া।

এরই মাঝে মায়া সঙ্গ পায় মিসেস ফ্লাওয়ারের। মায়ার সামনে উন্মোচিত হয় সাহিত্য জগতের আলো। বইকে সে ‘বন্ধু’ রূপে পায় সারাজীবনের মতো। কিন্তু ঘৃণার অনুভূতি মায়াকে ছাড়ে না। তার চিকিৎসা শহরের একমাত্র দাঁতের ডাক্তার করে না, শুধু মায়ার গায়ের রঙ ‘কালো’ বলে।

মায়ার 'আই নো হোয়াই দ্য কেজড বার্ড সিংস' লেখার ৯১ বছর আগে। মায়ার মতো থেঁতলানো শৈশব রবীন্দ্রনাথের নয় অবশ্যই। তিনি সুপুরুষ, শিক্ষিত ও অভিজাত। কিন্তু রবীন্দ্র-শৈশবও একার্থে খাঁচায় বন্দি ছিল না কি? 

মাঝে কিছু দিন নিজের বাবার কাছে থাকতে যায় মায়া। বাবার বান্ধবী তার গায়ে হাত তোলে। মায়া এবার ঘরের মায়া ছাড়ে। গৃহহীন রাস্তার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে থাকতে শুরু করে। হাই স্কুলে এন্ট্রান্স পরীক্ষার আগেই চাকরি শুরু করে রাস্তার ছোট্ট প্যাসেঞ্জার গাড়ির কন্ডাক্টর রূপে। হয়ে ওঠে সান ফ্রান্সিসকোর প্রথম কৃষ্ণাঙ্গী নারী কন্ডাক্টর। মায়া এরপর গর্ভবতী হলো। প্রেমিক ছেড়ে চলে গেল তাকে। বেইলির পরামর্শে গর্ভবতী অবস্থার কথা স্কুলে না জানিয়ে মায়া পরীক্ষা দেয় এবং পাশ করে।

উথাল-পাতাল কিশোরী মায়া কখন যেন ‘মা মেরি’ হয়ে ওঠে। পুত্রসন্তান প্রসব করে। খাঁচার পাখি মায়া এবার গান গেয়ে ওঠে। সেই গান ছড়িয়ে পড়ে মায়ের কর্মে– কখনো নর্তকী রূপে, কখনো লেখিকা রূপে, আবার কখনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও প্রশাসক রূপে। এর পাশাপাশি চলে সফল ফিল্ম নির্দেশনা। 

মার্টিন লুথার কিংয়ের অনুপ্রেরণায় মায়া হয়ে ওঠে আমেরিকায় ‘কালো মেয়ে’-দের নাগরিক অধিকার রক্ষার আন্দোলনের মুখ। কিন্তু মায়ার চোখ ঝলসানো সাফল্যও তার শৈশবের খাঁচাবন্দি জীবনের স্মৃতিকে মুছতে পারে না।

এই কৃষ্ণকলি মায়ার মতো রবিঠাকুরও আশ্চর্যভাবে লিখেছেন ‘দুই পাখি’-র মতো কবিতা, ১৮৯২ সালে যখন তার ৩১ বছর বয়স। লিখছেন– ‘খাঁচার পাখি’ ও ‘বনের পাখি’র কথা। মায়ার 'আই নো হোয়াই দ্য কেজড বার্ড সিংস'। রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত জীবন অতীব সুখের এমন বোধ করি বলা চলে না। অবিশ্রান্ত মৃত্যুর মিছিল থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছেন, ক্রমশ আরও আঁকড়ে ধরেছেন উপনিবেসদের সান্নিধ্য।

‘জীবনস্মৃতি’-তে লিখছেন বাল্যবেলার বন্দিদশার কথা, বাইরের আকাশ ও প্রকৃতিকে জানালা দিয়ে দেখার কথা, মা-বাবার নৈকট্য ছাড়া গৃহভৃত্যদের তত্ত্বাবধানে বাল্যকাল কাটানো। মায়ার মতো রবীন্দ্রনাথও ভুলতে পারেননি শৈশবে খাঁচা-বদ্ধ হওয়ার আখ্যান। ‘দুই পাখি’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ আশাবাদী নন মায়ার মতো। তিনি শেষ করেন ‘খাঁচার পাখি’-র হতাশা দিয়ে: ‘হায়! মোর শকতি নাহি উড়িবার।’ ‘গুরুদেব’ উপাধি ছেড়ে হয়ে উঠতে চেয়েছেন কবি ও গানের মানুষ। দেশ, ধর্ম ও জাতির সীমাবদ্ধতা তাকেও কুরে কুরে খেয়েছে।

সূত্র: সংগৃহীত

পিআর/টিকে

মন্তব্য করুন