এনবিআর সংস্কার ছাড়া ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব নয়: অর্থমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
০৯:৪৮ এএম | ১২ মে, ২০২৬
রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া দেশের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও নাগরিক সেবাদানের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কার্যকর সংস্কার এখন অপরিহার্য।
সোমবার (১১ মে) রাতে রাজধানীর হোটেলে শেরাটনে দৈনিক বণিক বার্তার ‘সোনার বাংলা’ নীতি-আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, যেকোনো অর্থনীতিতে রিসোর্স মোবিলাইজেশন সবচেয়ে ফান্ডামেন্টাল বিষয়।
কিন্তু বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত একসময় ১০ থেকে ১১ শতাংশ থাকলেও এখন তা ৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বিশ্বের সবচেয়ে নিম্ন ট্যাক্স-জিডিপি সম্পন্ন দেশগুলোর মধ্যে আমরা চলে গেছি। দক্ষিণ এশিয়ায়ও আমরা সবচেয়ে নিচে। তিনি বলেন, রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়ায় সরকারের ব্যয় করার আর্থিক সক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তার ভাষায়, ফিসক্যাল স্পেস না থাকলে উন্নয়ন কর্মসূচি নেওয়া যায় না, সামাজিক কর্মসূচিও চালানো যায় না। তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও কমতে থাকে। নাগরিকদের দৈনন্দিন সেবা দেওয়া থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান বাড়ানো—সব ক্ষেত্রেই সরকারের সক্ষমতা কমে যায়।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটিকে আবার বাড়ানোর বিষয়টিই সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে প্রথমেই এনবিআরের সংস্কার করতে হবে। এনবিআর রিফর্ম ইজ এ মাস্ট।
এনবিআর সংস্কার নিয়ে আগের সরকারের উদ্যোগের সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, নীতি ও বাস্তবায়ন (পলিসি ও এক্সিকিউশন) আলাদা করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল অসম্পূর্ণ।
তিনি বলেন, ওই উদ্যোগ আসলে পূর্ণাঙ্গ সংস্কার ছিল না। অসম্পূর্ণ সংস্কার (হাফ-বেকড রিফর্ম) বিপজ্জনক। কিছু না থাকলে বরং সুবিধা হতো। কিন্তু অসম্পূর্ণ অবস্থায় রেখে দিলে সেটা আরও সমস্যার সৃষ্টি করে।
তিনি জানান, আগের কাঠামোটি পুনর্বিবেচনা করে নতুনভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য সংসদে বিল স্থগিত করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রথমে ওই অসম্পূর্ণ কাঠামোটি বাতিল বা সংশোধন করতে হবে, এরপর নতুনভাবে সংস্কার করতে হবে। আমরা যত দ্রুত সম্ভব কার্যকর দুইভাগে বিভক্ত (বাইফারকেশন) করতে চাই। ট্যাক্স নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু ব্যুরোক্রেটিক দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে যাওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
তার ভাষায়, ট্যাক্স পলিসি যারা নির্ধারণ করবে, তাদের বাংলাদেশের অর্থনীতির ডিএনএ বুঝতে হবে। দেশের প্রতিটি সেক্টরের বাস্তবতা, ব্যবসায়ীদের সমস্যা, সাধারণ মানুষের চাহিদা—সবকিছু সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু অফিসে বসে হিসাব মিলানোর জন্য কর বাড়ালে হবে না। ব্যবসার পেইন বুঝতে হবে, ইন্ডাস্ট্রির পেইন বুঝতে হবে, সাধারণ মানুষের পেইন বুঝতে হবে। বর্তমান কর ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হিসেবে একই করদাতার ওপর বারবার চাপ বাড়ানোর প্রবণতার কথা উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ট্যাক্স কম পড়লেই বলা হয়—এখান থেকে এত শতাংশ বাড়াও, ওখান থেকে এত শতাংশ বাড়াও। এভাবে শুধু হিসাব মেলানো যায়, কিন্তু অর্থনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা যায় না। তার মতে, অতিরিক্ত করের চাপ বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তিনি বলেন, যারা বিনিয়োগ করছে, যারা মূলধন রিজার্ভ বাড়াচ্ছে, তাদের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি করলে তারা পুনরিবিনিয়োগ করতে পারবে না। এই জায়গায় আমাদের ট্যাক্স পলিসিতে পরিবর্তন আসবে। করনীতিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে বের করে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার কথাও বলেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আমরা চাই ট্যাক্স পলিসির সুপারিশ সরাসরি অর্থ মন্ত্রণালয়ে আসুক। মাঝখানে অতিরিক্ত ব্যুরোক্রেটিক ট্যাঙ্গেল (প্রশাসনিক জটিলতা) থাকলে সমস্যা তৈরি হয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আমরা টোটালি ট্রান্সপারেন্ট পলিসি চাই। ট্যাক্স-জিডিপি বাড়াতে হবে, কিন্তু এমনভাবে বাড়াতে হবে যাতে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
কর সংস্কারের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নেও রাজস্বের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড পেতে হলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বড় বিনিয়োগের বিকল্প নেই। এই দুই খাতে বিনিয়োগ ছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি সম্ভব নয়। আগামী কয়েক বছরে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত এই খাতে বিনিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে। যদিও এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় যেতে পারিনি, তবে আগামী ৪-৫ বছরে এই বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, সরকার দেশব্যাপী স্কিলিং, রিস্কিলিং ও আপস্কিলিং কার্যক্রমে বড় বিনিয়োগ করবে, যাতে দেশের শিল্প ও অর্থনীতির জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা যায়।
বিদেশগামী শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়িয়ে রেমিট্যান্স আয় বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এখন যে রেমিট্যান্স আসছে, তার বড় অংশ নিম্নদক্ষ শ্রমিকদের কাছ থেকে আসছে। অথচ অনেক দেশের তুলনায় আমাদের পার ক্যাপিটা রেমিট্যান্স কম। কারণ তারা মানবসম্পদ উন্নয়নে সফল হয়েছে।
তিনি জানান, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের রেমিট্যান্স আয় ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতে স্কিল ডেভেলপমেন্ট খাতে অনেক বিনিয়োগ হলেও তার বড় অংশ কার্যকর হয়নি। কারণ অধিকাংশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি বা সনদ ছিল না।
তিনি বলেন, অ্যাক্রেডিটেশন ও সার্টিফিকেশন ছাড়া কোনো স্কিলিং প্রকল্প কার্যকর হয় না। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ভবিষ্যতে কোনো ভোকেশনাল বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছাড়া বিনিয়োগ করা হবে না।
মন্ত্রী আরও বলেন, আমরা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছি, অ্যাক্রেডিটেশন ও সার্টিফিকেশন ছাড়া কোনো প্রকল্প হবে না।
এমআই/এসএন