হামের সংকট নিয়ে সংসদীয় তদন্ত কমিটি চাইলেন তাসনিম জারা
ছবি: সংগৃহীত
১০:৫৭ এএম | ১৫ মে, ২০২৬
সাবেক এনসিপি নেত্রী ডা. তাসনিম জারা বলেছেন, হামের এই সংকট এক সময় শেষ হবে। কিন্তু যে প্রশ্নটা থেকে যাবে, কেন আমরা এই অবস্থায় এসে পড়লাম? সেই প্রশ্নের জবাব আমাদের নিতেই হবে। সেটার জন্য প্রয়োজন সংসদীয় তদন্ত কমিটি।
তিনি বলেন, হামের ভাইরাস বাতাসে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি ঘর থেকে বের হওয়ার ২ ঘণ্টা পরেও সেখানে কেউ ঢুকলে হামে আক্রান্ত হতে পারেন। একজন হামে আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে।
কোভিড বা ফ্লু-এর তুলনায় এই সংখ্যা অনেক বেশি। এ কারণে হামের আউটব্রেক ঠেকাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকা নেওয়া প্রয়োজন। এটাই ‘হার্ড ইমিউনিটি’ এর সীমা। এর নিচে নামলেই ফাঁক তৈরি হয়, আর সেই ফাঁক দিয়ে ভাইরাস ঢুকে পড়ে। কোথায় ফাঁকা আছে, সেটা খুঁজে বের করতে না পারলে ভাইরাস আটকানো সম্ভব না।
বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা দেওয়া হলেও আউটব্রেক হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, জাতীয় কভারেজ গড়ে ৯০ বা ৯৫ শতাংশ হলেও, এই গড়ের ভেতরে অনেক রকম তারতম্য থাকতে পারে। দেশের বেশিরভাগ এলাকায় কভারেজ ৯৭ শতাংশ হতে পারে, কিন্তু কোনো একটা নির্দিষ্ট পকেটে, কিন্তু একটা চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা, শহুরে বস্তি, কিংবা একটা প্রত্যন্ত উপজেলা, এসবের কোনোটাতে কভারেজ হয়ত ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। জাতীয় গড়ে এই পকেট ঢাকা পড়ে যায়, কিন্তু ভাইরাসের কাছে সেটা ঢাকা পড়ে না। একজন আক্রান্ত মানুষ এমন একটা কমিউনিটিতে ঢুকলে সেখানে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
হামের প্রাদুর্ভাব অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, যেখানে কেস পাওয়া যাচ্ছে, সেই এলাকাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করতে হবে। শুধু জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে নয়, বরং ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, গ্রাম বা মহল্লা পর্যায়ে। একটা জাতীয় হাম হটলাইন বা কল সেন্টার চালু করা। এর মাধ্যমে হামের কেস শনাক্তকরণ, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং, রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড এবং চিকিৎসার সমন্বয় - সবগুলোই করা সম্ভব। আমাদের জাতীয় টেলিমেডিসিন অবকাঠামোর উপর দাঁড়িয়েই এটা চালু করা সম্ভব।
তিনি বলেন, কল সেন্টারে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকেরা একটা সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলির মাধ্যমে যাচাই করবেন যে সম্ভাব্য হাম কিনা। যদি সন্দেহজনক হয়, অভিভাবককে সরাসরি ওই এলাকার হামের জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশনা দেবেন, যাতে তিনি এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরে নতুন কাউকে সংক্রমিত না করেন। সুস্থ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটা কেস নিয়মিত ফলো-আপ করবেন।
হামের সমস্যা সমাধানে জারার তিন পরামর্শ
প্রথমত, প্রতিটা এলাকায় একটা নির্দিষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্র। যেখানে সম্ভাব্য হামের রোগীদের পাঠানো হবে। প্রবেশের পরেই অন্য রোগীদের সঙ্গে না মিশে তাদেরকে আলাদা করে ফেলা হবে, ভর্তির জন্য আলাদা আইসোলেশন কক্ষ থাকবে, যথাযথ ভেন্টিলেশন থাকবে, এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকাপ্রাপ্ত হবেন। কল সেন্টার থেকে সরাসরি অভিভাবককে এই কেন্দ্রের নির্দিষ্ট কক্ষে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হবে। বাকি হাসপাতালগুলোতে সন্দেহভাজন কেস এলে তাঁদের অবিলম্বে আইসোলেট করে নির্দিষ্ট কেন্দ্রে রেফার করার একটা স্পষ্ট প্রটোকল থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, একটি ন্যাশনাল বেড-অ্যাভেইলেবিলিটি ড্যাশবোর্ড। যেখানে রিয়েল-টাইম আপডেট পাওয়া যাবে কোন হাসপাতালে কয়টা বেড খালি আছে, কয়টা আইসিউ সিট খালি আছে। কল সেন্টার থেকে সেই ড্যাশবোর্ড দেখে রোগীদেরকে সঠিক জায়গায় পাঠাবেন, যাতে আবার হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটতে না হয়। এই ব্যবস্থা না থাকার ভয়ংকর পরিণতি আমরা অনেকবার দেখেছি। হাসপাতালে সিট না পেয়ে দিশেহারা অভিভাবকদের কাছ থেকে দালাল চক্র টাকা হাতিয়ে নেয়। বিশেষ করে আইসিইউ বেড খুঁজতে খুঁজতে অনেক সময় চিকিৎসার অভাবে রোগী মারা যায়।
তৃতীয়ত, আইসিইউ সমস্যার জরুরি সমাধান। এবারের প্রাদুর্ভাবে অনেকে গুরুতর অসুস্থ হচ্ছেন। আইসিইউ সংকট আছে, বিশেষ করে ঢাকার বাইরে। হুট করে শিশুদের আইসিইউ ক্যাপাসিটি বাড়ানো প্রায় অসম্ভব একটা কাজ। তবে জরুরি ভিত্তিতে পিডিয়াট্রিক আইসিইউ-সম্বলিত প্রাইভেট হাসপাতালের সাথে সমন্বয় করা প্রয়োজন, যাতে প্রাণগুলো বাঁচানো যায়। বিএনপির ইশতেহারে স্বাস্থ্যে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছিল। প্রতি জেলায় না হলেও অন্তত প্রতি বিভাগে একটা পিডিয়াট্রিক আইসিইউ-সম্বলিত প্রাইভেট হাসপাতালের সাথে পার্টনারশিপ স্থাপন করে গুরুতর শিশুদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আরআই/এসএন