© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

লাগবে না হরমুজ, পাইপলাইন ও রেলে আসবে উপসাগরীয় তেল!

শেয়ার করুন:
লাগবে না হরমুজ, পাইপলাইন ও রেলে আসবে উপসাগরীয় তেল!

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৩:১৬ এএম | ১৮ মে, ২০২৬
হরমুজ প্রণালিতে চলমান তীব্র সামরিক অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সংকট মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থাকে এক সম্পূর্ণ নতুন এবং কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের প্রত্যক্ষ প্রভাবে এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস পরিবহন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্তও বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমাগত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, সমুদ্রে ভাসমান মাইনের আতঙ্ক এবং আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর আকাশচুম্বী বাড়তি বিমা খরচের কারণে এই রুট দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রাণঘাতী পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এখন সমুদ্রপথের ওপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে সুদূরপ্রসারী স্থলভিত্তিক অবকাঠামো ও পাইপলাইনের দিকে দ্রুত ঝুঁকছে।

রোববার (১৭ মে) মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ন্যাশনাল’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বিদ্যমান যুদ্ধাবস্থা বিবেচনা করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি ‘অ্যাডনক’ ওমান উপসাগর ঘেঁষা ফুজাইরাহ বন্দর পর্যন্ত তাদের বিদ্যমান প্রধান পাইপলাইনটি জরুরি ভিত্তিতে সম্প্রসারণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। এই মেগা প্রকল্পটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে কেবল স্থলপথের পাইপলাইনের মাধ্যমে আমিরাতের তেল রপ্তানি সক্ষমতা দৈনিক ৩০ থেকে সর্বোচ্চ ৩৪ লাখ ব্যারেলে গিয়ে পৌঁছাবে।

একইভাবে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় খনিগুলো থেকে লোহিত সাগর উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত দেশটির ‘পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন’ বর্তমান বৈশ্বিক তেলবাজারকে এক মহাবিপর্যয় থেকে রক্ষা করছে। আমিরাত ও সৌদির এই কার্যকর পদক্ষেপ দেখে এখন কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও ইরাকের মতো তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোও হরমুজকে এড়াতে বিকল্প নতুন রুট তৈরির উপায় খুঁজছে।

তেল পরিবহনের বাইরেও উপসাগরীয় অঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতির চাকা ও শিল্পায়ন দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রনির্ভর। ১৯৭০-এর দশক থেকে এই অঞ্চলে গড়ে ওঠা বড় বড় তেল শোধনাগার, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, পেট্রোকেমিক্যাল, সার এবং অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি চলত মূলত সমুদ্রপথে। দুবাইয়ের বিখ্যাত জেবেল আলি বন্দরসহ পারস্য উপসাগরের বড় বড় বন্দরগুলো শুধু স্থানীয় বাজার নয়, বরং ইরাক, পূর্ব আফ্রিকা এবং যুদ্ধের আগে ইরানেও পণ্য পরিবহনের প্রধান ট্রানজিট হাব হিসেবে কাজ করেছে। তবে বর্তমান সংঘাতের কারণে সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ হওয়ায় সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভারত মহাসাগরমুখী বন্দরগুলো আঞ্চলিক অর্থনীতিকে সচল রাখতে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একই সঙ্গে গতি পেয়েছে রেলপথভিত্তিক আঞ্চলিক প্রকল্পগুলো।

যুদ্ধের আগে শারজাহর ‘খোরফাক্কান বন্দরে’ সপ্তাহে যেখানে মাত্র দুই হাজার কনটেইনার খালাস হতো, বর্তমান সংকটের কারণে এখন তা জ্যামিতিক হারে বেড়ে সপ্তাহে প্রায় ৫০ হাজারে পৌঁছেছে। পাইপলাইন, হাইওয়ে সড়ক ও রেলপথের এই নজিরবিহীন ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চল ধীরে ধীরে একটি নিশ্ছিদ্র স্থলভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ইরানও দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমান উপসাগরের ‘জাস্ক বন্দরে’ নিজস্ব পাইপলাইন অবকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। তবে ওয়াশিংটনের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার করাল গ্রাসে তেহরানের সেই প্রকল্প আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি। এই ব্যর্থতার মাঝেই বর্তমানে তেহরান হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের একচেটিয়া সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের ওপর ‘ফি বা টোল’ আরোপের প্রস্তাব দিচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এই জলপথে যত বেশি নিয়ন্ত্রণ আরোপ বা প্রতিবন্ধকতা তৈরির চেষ্টা করবে, প্রতিবেশী আরব দেশগুলো তত বেশি বিকল্প স্থলপথ ব্যবহারে মরিয়া হয়ে উঠবে। অবশ্য সব ধরনের বাণিজ্যিক পণ্য রাতারাতি স্থলপথে পরিবহন করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি এখনো পুরোপুরি বিশেষায়িত জাহাজনির্ভর। এছাড়া সার, অ্যালুমিনিয়াম কিংবা পরিশোধিত ভারী জ্বালানির মতো পণ্য স্থলপথে পরিবহন করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। তবুও বর্তমানের এই মহাসংকট মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে শিক্ষা দিচ্ছে যে, সুদূর ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থে সমুদ্রনির্ভরতার ঝুঁকি কমিয়ে একটি স্থায়ী বিকল্প স্থলপথভিত্তিক সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে তোলা কতটা জরুরি।

এসকে/টিএ

মন্তব্য করুন