অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নয়: আইনমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত
০৩:৩৯ এএম | ১৮ মে, ২০২৬
অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিদের নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার কোনো প্রয়োজন নেই বলে স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, একজন প্রধান বিচারপতি অবসরে যাওয়ার পর থেকেই দিন গুনতে থাকেন কবে তিনি ওই রাজনৈতিক পদে যাবেন; অতীতে সাবেক প্রধান বিচারপতিদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন লাভজনক বা রাজনৈতিক জায়গায় বসানোর এক ধরণের কুৎসিত চেষ্টা আমরা দেখেছি। বর্তমান সরকার এই নেতিবাচক সংস্কৃতি থেকে স্থায়ী উত্তরণ ঘটাতে চায়।
রোববার (১৭ মে) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের অংশীজন সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ এই বিশেষ সভার আয়োজন করে, যেখানে সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং আইনমন্ত্রী।
দেশে রাজনৈতিক কর্মীরাই বিগত দিনে সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিগত শাসন আমলের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আগের সরকারের সময় রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে আদালত বসিয়ে বিচারের নামে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের তড়িঘড়ি করে সাজা দেওয়া হয়েছে, অথচ সেই অন্যায়ের রূপকাররা আজও জবাবদিহির বাইরে রয়ে গেছেন। আমরা অনেক সময় তাদের ফেরেশতার মতো দেখি, তারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমনকি আমরা সুপ্রিম কোর্টে শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদদের বিচারকের আসনে বসতেও দেখেছি। মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, নতুন জেনারেশন বা তরুণ প্রজন্ম অনেক বেশি মেধাবী এবং দেশের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় রোধে তাদের সঠিক ও যোগ্য জায়গায় বসাতে হবে; কারণ বিগত দিনে আমরা একের পর এক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পদ্ধতিগতভাবে নষ্ট করে ফেলেছি।
গুম সংক্রান্ত নতুন আইন প্রণয়নের অগ্রগতির বিষয়ে আইনমন্ত্রী জানান, এই আইনের সঙ্গে যেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন এবং মানবাধিকার কমিশন আইনের কোনো ধরণের সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি না হয়, সেজন্য ড্রাফটটি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তিনি বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার খসড়ার সমালোচনা করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেভাবে গুম কমিশন অধ্যাদেশ তৈরি করা হয়েছিল, তা অপরিপক্ক হওয়ায় অপরাধীরাই বেশি লাভবান হতো। বর্তমান সরকার সেটাকে আরও নিখুঁত ও সময়োপযোগী করার চেষ্টা করছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের মধ্যে ইতিমধ্যেই গুমের আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে এর তদন্ত ও কঠোর বিচার হবে। সরকার এমন একটি কার্যকরী ও কল্যাণমুখী আইন করতে চায় যাতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কোনো নখদন্তহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হয় এবং গুমের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলো প্রকৃত ন্যায়বিচার পায়।
উক্ত অংশীজন সভায় অন্যতম আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গুম হওয়া বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলীর স্ত্রী, বর্তমান সংসদ সদস্য তাহসীনা রুশদীর লুনা। তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘২০১২ সালে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে আমার স্বামীকে গুম করা হয়েছিল। এরপর বিগত বছরগুলোতে আরও অসংখ্য মানুষকে গুমের শিকার হতে হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও গুম হওয়া ব্যক্তিদের সম্পর্কে আমরা নতুন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাইনি।’ তিনি দেশ থেকে গুম কালচার চিরতরে নিষিদ্ধ করার এবং নিখোঁজদের সন্ধানে সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য সরবরাহের জোর দাবি জানান। এই নীতি নির্ধারণী সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি, ইউএনডিপি বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর, বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, জেলা ও দায়রা জজ শামসুদ্দিন মাসুম এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ও খালেদ হামিদ চৌধুরী প্রমুখ।
এসকে/টিএ