ইবোলা ভাইরাসের উপসর্গ কিভাবে চিনবেন?
ছবি: সংগৃহীত
১১:৩৭ এএম | ১৮ মে, ২০২৬
ইবোলা হলো একটি অত্যন্ত মারাত্মক এবং প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে রক্তনালিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এক ধরনের ‘হেমোরেজিক ফিভার’ বা রক্তক্ষরণকারী জ্বর তৈরি করে।
১৯৭৬ সালে আফ্রিকার জায়ারে (বর্তমানে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র) এই ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয়। এরপর থেকে সেখানে নিয়মিত বিরতিতে এর প্রাদুর্ভাব ঘটছে। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে আফ্রিকায় ইবোলার সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, যাতে প্রায় সাড়ে ২৮ হাজার মানুষ আক্রান্ত হন এবং ১১ হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। সম্প্রতি কঙ্গো ও উগান্ডায় ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে চলায় এটিকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
ইবোলার প্রকারভেদ
মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে এমন ৪টি প্রধান ইবোলা স্ট্রেইন বা প্রজাতি রয়েছে। এগুলো যে এলাকায় প্রথম পাওয়া গিয়েছিল, সেই জায়গার নামেই এগুলোর নামকরণ করা হয়েছে :
জায়ারে ইবোলাভাইরাস : এটি ইবোলার সবচেয়ে সাধারণ এবং সবচেয়ে মারাত্মক রূপ। চিকিৎসা না পেলে এতে আক্রান্ত ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই মারা যেতে পারেন।
সুদান ইবোলাভাইরাস : এটিও বেশ প্রাণঘাতী, আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেকই এতে মারা যান।
বান্ডিবুগিও ইবোলাভাইরাস : অন্যান্য প্রজাতির তুলনায় এটি কিছুটা কম মারাত্মক। এতে মৃত্যুর হার প্রায় ৩০% (১০ জনের মধ্যে ৩ জন)।
তাই ফরেস্ট ইবোলাভাইরাস : এটি ইবোলার সবচেয়ে বিরল প্রজাতি এবং এটি তেমন একটা প্রাণঘাতী নয়।
লক্ষণ ও উপসর্গ
ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ২ দিন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৩ সপ্তাহের মধ্যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। লক্ষণগুলো সাধারণত দুই ধাপে দেখা দেয় :
১।
প্রথম ধাপ (শুরুর লক্ষণ) :
প্রাথমিকভাবে ইবোলার লক্ষণগুলো সাধারণ ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো হয়। যেমন— তীব্র জ্বর, ঠাণ্ডা লাগা, প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও গলাব্যথা, শরীর দুর্বল লাগা, পেশিতে ব্যথা ও ক্ষুধামন্দা।
২। দ্বিতীয় ধাপ (গুরুতর লক্ষণ) :
রোগটি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষণগুলো আরো বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। যেমন—তীব্র বমি ও ডায়রিয়া, চোখ লাল হওয়া এবং ত্বক বা চোখের নিচে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ পড়া, শরীরের ভেতরে ও বাইরে মারাত্মক রক্তক্ষরণ হওয়া, মানসিক বিভ্রান্তি দেখা দেওয়া, খিঁচুনি হওয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া।
সংক্রমণের কারণ ও যেভাবে ছড়ায়
ইবোলা কোনো বায়ুবাহিত রোগ নয়, অর্থাৎ এটি হাঁচি-কাশি বা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না। আফ্রিকার ফলভোজী বাদুড়, বানর ও অ্যান্টিলোপের মতো আক্রান্ত বন্য পশুর মাংস খেলে বা এদের সংস্পর্শে এলে মানুষ সংক্রমিত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের কোনো তরল পদার্থ (যেমন—রক্ত, বমি, লালা, প্রস্রাব, পায়খানা, ঘাম ও বুকের দুধ) সুস্থ মানুষের শরীরের সংস্পর্শে এলে এটি ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির বীর্যের মাধ্যমে যোনিপথ, মুখ বা পায়ুসংগম—সব পথেই ইবোলা ছড়াতে পারে। আক্রান্ত রোগীর ব্যবহৃত সুচ, সিরিঞ্জ, বিছানা বা কাপড়ের মাধ্যমেও অন্য কেউ আক্রান্ত হতে পারেন।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
ইবোলার লক্ষণগুলো ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড বা ইয়েলো ফিভারের মতো হওয়ায় শুরুতে এটি নির্ণয় করা কঠিন। চিকিৎসকরা রোগীর ভ্রমণ ইতিহাস ও লক্ষণ দেখে রক্ত পরীক্ষার (পিসিআর টেস্ট) মাধ্যমে রোগটি নিশ্চিত করেন।
চিকিৎসা পদ্ধতি
১. নির্দিষ্ট ওষুধ : ইবোলা ভাইরাসের চিকিৎসায় ‘ইবাঙ্গা’ ও ‘ইনমাজেব’ নামের দুটি মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি চিকিৎসা ব্যবহার করা হয়, যা রোগীর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
২. সহায়ক সেবা : এর পাশাপাশি রোগীকে শিরায় তরল (স্যালাইন) দেওয়া, অক্সিজেন দেওয়া এবং রক্তচাপ ও ব্যথার ওষুধ দিয়ে লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যাবে, রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তত বাড়বে।
ইবোলা থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠার পর মানুষের শরীরে যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, তা তাকে পরবর্তী প্রায় ১০ বছর এই রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখে। তবে সুস্থ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় ধরে রোগীদের কিছু জটিলতা থাকতে পারে। যেমন— চোখ ও পেটে ব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, ঝাপসা দৃষ্টি বা অন্ধত্ব এবং ত্বক ওঠা।
প্রতিরোধের উপায়
টিকা গ্রহণ : ইবোলা ভাইরাসের ঝুঁকি থেকে বাঁচতে বর্তমানে ‘এরভেবো’ ও ‘জ্যাবডিনো/ম্যাভবেয়া’ নামের কার্যকর টিকা রয়েছে। ল্যাবের কর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভ্রমণকারীদের এই টিকা দেওয়া হয়।
ব্যক্তিগত সুরক্ষা : আক্রান্ত রোগীর সেবা করার সময় অবশ্যই পিপিই (মাস্ক, গ্লাভস, ফেস শিল্ড) ব্যবহার করতে হবে।
সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা : ইবোলা আক্রান্ত বা মৃত মানুষ ও প্রাণীর দেহাবশেষ ও তরল স্পর্শ করা যাবে না। হাত ধোয়া : যেকোনো সম্ভাব্য সংস্পর্শের পর সাবান-পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে।
সূত্র : ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক
এবি/টিএ