© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

নতুন নথি ফাঁসইমরান খানকে সরাতে কলকাঠি নেড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র

শেয়ার করুন:
ইমরান খানকে সরাতে কলকাঠি নেড়েছিল যুক্তরাষ্ট্র

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৪:০৪ পিএম | ১৮ মে, ২০২৬
ফাঁস হওয়া একটি গোপন কূটনৈতিক নথি পাকিস্তানের কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সেই ‘বিদেশি ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। দেশটিতে ‘সাইফার’ নামে পরিচিত এই নথিতে ২০২২ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আসাদ মাজিদ খান ও মার্কিন কূটনীতিক ডোনাল্ড লুর মধ্যকার এক কথোপকথনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। আসাদ মাজিদ ও ডোনাল্ড লুর ওই আলোচনার সূত্র ধরেই ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ এবং পরবর্তীতে তার কারাবাসের পথ প্রশস্ত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ড্রপ সাইট ওই মূল নথিটি (ক্যাবল আই-০৬৭৮) প্রকাশ করেছে। ড্রপ সাইট বলছে, ২০২২ সালের ৭ মার্চের এক বৈঠকে তৎকালীণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইমরান খানকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে ইসলামাবাদকে উদ্বুদ্ধ করে। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার বিষয়ে ইমরান খানের নিরপেক্ষ অবস্থানের কারণেই ওয়াশিংটন ওই চাপ প্রয়োগ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে অভিযানের জন্য মার্কিন বাহিনীকে পাকিস্তানের ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ায় ওয়াশিংটন ইমরান খানের ওপর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ছিল।

 • ইমরান খানের ক্ষমতাচ্যুতি
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরাবরই দাবি করে আসছেন, তার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের পক্ষে অবস্থান নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় পাকিস্তানের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোর (পিএমএল-এন ও পিপিপি) সঙ্গে মিলে তাকে সরানোর ষড়যন্ত্র করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২২ সালের এপ্রিলের এক বিবৃতিতে তৎকালীন এই পাক প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‘আমেরিকা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায়... এবং সেটি করতে পারলেই সব অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’’


তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদবিরোধী মার্কিন যুদ্ধের কঠোর সমালোচনা এবং তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর দূর-নিয়ন্ত্রিত অভিযানের জন্য পাকিস্তানের ভূমি ব্যবহার করতে না দেওয়াটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

সেই সময় ইমরান খান বলেছিলেন, ‘‘তারা বলছে ইমরান খান যদি অনাস্থা ভোটে হেরে যান, তাহলেই কেবল আমাদের ক্ষোভ প্রশমিত হবে।’’

তবে ওয়াশিংটন তাৎক্ষণিকভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তৎকালীন মুখপাত্র নেড প্রাইস বলেন, এসব দাবির কোনও সত্যতা নেই। তিনি বলেন, আমরা পাকিস্তানের পরিস্থিতির দিকে কড়া নজর রাখছি। আমরা পাকিস্তানের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং এতে আমাদের সমর্থন রয়েছে।

• সব ক্ষমা করে দেওয়ার প্রস্তাব
ড্রপ সাইটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের ৭ মার্চ ডোনাল্ড লুর সঙ্গে বৈঠক করেন আসাদ মাজিদ খান। ফাস হওয়া ক্যাবলে রেকর্ড করা ওই কথোপকথনে লু পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতকে জানান, অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ইমরান খানকে যদি ক্ষমতা থেকে সরানো হয়, তাহলে ইসলামাবাদের প্রতি ওয়াশিংটনের যাবতীয় ক্ষোভ মিটে যাবে এবং সব ক্ষমা করে দেওয়া হবে।

সতর্ক করে দিয়ে লু বলেন, ইমরান খান ক্ষমতায় থাকলে ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তান প্রবলভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

২০২২ সালের ৯ এপ্রিল সামরিক বাহিনীর পরোক্ষ সমর্থনে এক অনাস্থা ভোটে ৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান ক্ষমতা হারান। এর এক বছর পর, তিনি এবং তার স্ত্রী বুশরা বিবি দুর্নীতি, আদালত অবমাননা এবং রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ফাঁসের অভিযোগে দণ্ডিত হয়ে কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে তার দল পিটিআইকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং তাদের নির্বাচনী প্রতীক কেড়ে নেওয়া হয়। এমনকি স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী পিটিআই সমর্থিত প্রার্থীদের গেজেট প্রকাশেও বাধা দেওয়া হয়।

• ইমরান খানের ‘নিরপেক্ষতা’ ও সম্পর্কের টানাপোড়েন
প্রায় দুই দশক ধরে মার্কিন কর্মকর্তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তালেবানদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলে আসছিলেন। যদিও মিত্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে শত শত কোটি ডলার সহায়তা নিয়ে আসছে পাকিস্তান। বিশেষ করে ২০১১ সালে অ্যাবোটাবাদে ইসলামাবাদের অগোচরে মার্কিন কমান্ডো অভিযানে ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানের ভাবমূর্তি চরম সংকটে পড়ে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শাসনকালে পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। মার্কিন এই প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন, দেশটি সন্ত্রাসবাদ দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। পরবর্তীতে বাইডেন প্রশাসনও ইমরান খানের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলে।

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পর ইমরান খান পাকিস্তানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। সেই সময়ই ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে ইমরান খান নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের সরকারের। গোপন নথিতে দেখা গেছে, একই সময়ে সৌদি আরবও একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির জন্য পাকিস্তানের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছিল।

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের দিনেই ইমরান খান মস্কো সফরে ছিলেন। যদিও ওয়াশিংটন আগে থেকেই এই সফর বাতিলের অনুরোধ জানিয়েছিল। এরপর জাতিসংঘে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আনা নিন্দা প্রস্তাবে পাকিস্তান ভোটদানে বিরত থাকায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে তিক্ততা আরও বৃদ্ধি পায়।

ইমরান খানের সরকার ওয়াশিংটন এবং উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)—উভয় পক্ষের সাথেই নির্দিষ্ট কূটনৈতিক সীমারেখা মেনে চলার চেষ্টা করছিল। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ধারণা করেছিল, এই নীতির কারণে পাকিস্তান বিশ্বজুড়ে একা হয়ে পড়ছে।

ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই ডোনাল্ড লু ইউক্রেন ইস্যুতে পাকিস্তানের ‘কঠোর নিরপেক্ষ অবস্থান’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি তৎকালীন দূতকে বলেছিলেন, আমার মনে হয় প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোট সফল হলে ওয়াশিংটনের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। কারণ রাশিয়ার সফরটিকে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যথায় সামনে পথ চলা খুব কঠিন হবে।

• সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও পটপরিবর্তন
ড্রপ সাইটের প্রকাশিত নথিপত্র অনুযায়ী, সে সময় সৌদি আরবও একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির জন্য পাকিস্তানের ওপর চাপ বাড়াচ্ছিল। কিন্তু ইমরান খানের সরকার তাদের কূটনৈতিক স্বকীয়তা বজায় রাখার পক্ষেই অনড় ছিল।

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ইমরান খানের এই অবস্থানকে দেশের জন্য হুমকি মনে করে। ২০২১ সালের জুলাই মাসের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর অগোচরেই সামরিক বাহিনী ওয়াশিংটনে সিআইএর একজন সাবেক স্টেশন প্রধানকে লবিস্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়। এটি ছিল সামরিক বাহিনীর নিজেদের সরকারের সমান্তরালে স্বাধীনভাবে কাজ করার এক প্রাথমিক সংকেত।

ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সামরিক বাহিনী সমর্থিত নতুন সরকার মার্কিন কৌশলগত লক্ষ্যের দিকে আরও ঝুঁকে পড়ে। সেই সময় ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য কামানের গোলা সরবরাহ শুরু করে পাকিস্তান; যা মার্কিন ঠিকাদার ও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল।

ড্রপ সাইটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধে সামরিক সরবরাহ অব্যাহত রাখার শর্তের সঙ্গেই আইএমএফের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে দেওয়া ঋণ সহায়তার বিষয়টি অলিখিতভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান সেই সৌদি প্রতিরক্ষা চুক্তিতেও স্বাক্ষর করে; যা ইমরান খানের সরকার এতদিন আটকে রেখেছিল।

সূত্র: এনডিটিভি।

টিজে/টিকে 

মন্তব্য করুন