© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

‘স্কালোনি উইল বি ফেটেড, মেসি উইল বি সেইন্টেড’

শেয়ার করুন:
‘স্কালোনি উইল বি ফেটেড, মেসি উইল বি সেইন্টেড’

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৯:২৪ পিএম | ২০ মে, ২০২৬
২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে গঞ্জালো মন্টিয়েলের শেষ পেনাল্টি শট। সারা বিশ্ব তখন তাকিয়ে আদতেই সেই কিকে গোল হবে কিনা। গোল হলে দীর্ঘ ৩৬ বছরের বিশ্বকাপ শিরোপা খরা ঘুচবে আর্জেন্টিনার। মন্টিয়েল শট নিলেন, সাথে সাথে ধারাভাষ্যকার পিটার ড্রুরি তার স্বভাবসুলভ উত্তেজনার সুরে বললেন, ‘স্কালোনি উইল বি ফেটেড, মেসি উইল বি সেইন্টেড’।

এই কথাগুলো মনে থাকার কথা আর্জেন্টিনার সমর্থকদের। কথাগুলোর বাংলা করলে অর্থ দাঁড়ায়, স্কালোনির নিয়তিতে লেখা হবে সাফল্য এবং মেসি হবেন পরিপূর্ণ ( ফুটবল ঈশ্বর)। এই কাব্যিক লাইন দুটো যেন আর্জেন্টিনা ও ফুটবলের সাথে মেসি ও আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির অবস্থাকেই বর্ণনা করেছে।

কাতার বিশ্বকাপের আগে ২০১৮ সালে যখন আর্জেন্টিনার দ্বায়িত্ব নেন স্কালোনি, তখন তার কোনো বড় দলের কোচিং করানো অভিজ্ঞতা ছিলো না। এমনকি আর্জেন্টিনার ফুটবলের মহাতারকা ডিয়েগো ম্যারাডোনা তার দায়িত্ব পাওয়ার সময় মন্তব্য করেছিলেন, স্কালোনি ঠিকমতো ট্রাফিকের দায়িত্বও পালন করতে পারবেন না। তবে ভঙ্গুর আর্জেন্টিনাকে তিনি গড়ে তুলেছেন নতুন করে। দীর্ঘ ২৮ বছরের ট্রফি খরা কাটিয়ে তার সময়েই আর্জেন্টিনা জেতে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা। আর ৩৬ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পালা শেষ করে তিনিই জেতান স্বপ্নের সেই বিশ্বকাপ। অনেকটা অবিশ্বাস্য তার এই যাত্রায় মনে হতেই পারে তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল।



অন্যদিকে লিওনেল মেসি, ফুটবলের ইতিহাসে জীবন্ত কিংবদন্তি। ২০২২ সালের বিশ্বকাপের আগে এমন বিশ্বকাপ ছাড়া এমন কোনো অর্জন নেই যা ছিল না তার ঝুলিতে। ফিফার বর্ষসেরা খেতাব 'ব্যলন ডি অর' এটি যেন তার নিজস্ব সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছিলেন। পেয়েছেন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের খেতাবও। তবে তার ঝুলিতে ছিল না মাত্র বিশ্বকাপ ট্রফিটিই। তার মতো কিংবদন্তির কাছে বিশ্বকাপ না যাওয়াটা ছিল যেন ট্রফিরই অপমান। সেই খরা কাটিয়ে যখন তার হাতে উঠলো ট্রফি, তখন যেন পূর্ণতা পেল বিশ্বকাপ নিজেই। আর ফুটবলের ইতিহাসে মেসির স্থান হলো অনন্য এক উচ্চতায়।

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসটা বেদনা বিধুরই বলা চলে। তারা ৩টি শিরোপা জিতলেও রানার্সআপ হয়েছ আরও ৩ বার। প্রথম বিশ্বকাপের আসরে উরুগুয়ের কাছে হেরে শিরোপা বঞ্চিত হয় তারা। টুর্নামেন্ট শুরুর ৪৮ বছর পর এসে শিরোপা ওঠে তাদের হাতে। ১৯৭৮ সালে ঘরের মাঠে প্রথম বিশ্বজয়ের স্বাদ পায় আলবিসেলেস্তেরা। সেই আসরের মহাতারকা ছিলেন মারিও কেম্পেস। তিনি ৬ গোল করে একাধারে গোল্ডেন বুট ও গোল্ডেন বল জেতেন সেবারের আসরে।

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত, রোমাঞ্চকর এবং একক নৈপুণ্যের বিশ্বকাপ ছিল ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ। আর এর একমাত্র রূপকার ছিলেন ফুটবল ঈশ্বর ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার করা প্রথম গোলটি ইতিহাসে ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে পরিচিত। তবে এর ঠিক চার মিনিট পর মাঝমাঠ থেকে একাই ড্রিবলিং করে ইংল্যান্ডের ৫ জন খেলোয়াড় ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে তিনি যে গোলটি করেছিলেন, তা ফিফার স্বীকৃতিতে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ (গোল অব দ্য সেঞ্চুরি) হিসেবে অমর হয়ে আছে।

সেই আসরের ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা জয় করে। এই বিশ্বকাপের হাত ধরেই সুদূর বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার এক বিশাল ও চিরস্থায়ী সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হয়। যে সমর্থকগোষ্ঠী স্বয়ং আর্জেন্টিনায় সমাদৃত।

১৯৮৬ সালের পর আরও দুবার ফাইনাল খেললেও শিরোপা ছুঁতে পারেনি আর্জেন্টিনা। ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আবারও ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠলেও পশ্চিম জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা খোয়ায় তারা। দীর্ঘ ২৪ বছরের অপেক্ষা শেষ করে লিওনেল মেসির জাদুতে আবারও ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে আলবিসেলেস্তেরা। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তের গোলে জার্মানির কাছে ১-০ ব্যবধানে হেরে কোটি ভক্তের হৃদয় ভাঙে। মেসি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় (গোল্ডেন বল) হলেও ট্রফি অধরাই থেকে যায়।

৩৬ বছরের দীর্ঘ খরা, একের পর এক ফাইনাল হারার বেদনা আর আক্ষেপের অবসান ঘটে ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে। ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফাইনালে ফ্রান্সের মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের খেলা ৩-৩ গোলে ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে হারিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। কিলিয়ান এমবাপ্পের হ্যাটট্রিক রুখে দিয়ে লিওনেল মেসি নিজের ক্যারিয়ারের একমাত্র অপূর্ণতা দূর করে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন। কোচ লিওনেল স্কালোনির মাস্টারপ্ল্যানে বিশ্বজয় করে আর্জেন্টিনা।

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ঝুলিতে রয়েছে মোট ৩টি শিরোপা (১৯৭৮, ১৯৮৬, ২০২২)। আর ৩ বার হয়েছে রানার্সআপ (১৯৩০, ১৯৯০, ২০১৪)। আর খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে লিওনেল মেসির ঝুলিতেই রয়েছে, একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুইবার (২০১৪ ও ২০২২) সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার 'গোল্ডেন বল' জেতার অনন্য কীর্তি। এছাড়া বিশ্বকাপের ইতিহাসে মোট ৮৮টি ম্যাচ খেলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা দলগুলোর তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে আর্জেন্টিনা।

এত এত অর্জন যখন ঝুলিতে তখন পিটার ড্রুরির সেই কথাটা যেন বাস্তব হয়েই প্রতিফলিত হয় মেসির ক্ষেত্রে। ‘স্কালোনি উইল বি ফেটেড, মেসি উইল বি সেইন্টেড’ যে তিনি এতটুকু বাড়িয়ে বলেননি, ইতিহাসই তো সেই প্রমাণ দিচ্ছে।

আইকে/টিএ

মন্তব্য করুন