মেয়াদ শেষের পথে, কাজ অসম্পূর্ণ, কেবিএস প্রকল্পের অনিশ্চয়তায় বাড়ছে জনদুর্ভোগ
ছবি: সংগৃহীত
০২:৪৪ পিএম | ২১ মে, ২০২৬
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং জনদুর্ভোগ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০১৬ সালে অনুমোদন পেয়েছিল কেবিএস প্রকল্প। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার সড়ক এবং অবকাঠামো উন্নয়নের বড় উদ্যোগ হিসেবে নেওয়া এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৩০ জুন। তবে মেয়াদ শেষ হতে আর অল্প কিছুদিন বাকি থাকলেও বাস্তবে প্রকল্পের শতাধিক উন্নয়নকাজ এখনও অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তিন জেলার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক খনন করে ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও সেতুর কাজ অর্ধেক অবস্থায় থেমে আছে, আবার কোথাও কালভার্ট নির্মাণ দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। বর্ষা সামনে রেখে স্থানীয়দের মধ্যে এখন উদ্বেগ আরও বাড়ছে ।
এ পরিস্থিতিতে প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে বাস্তব তথ্য গোপন, একক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনপ্রতিনিধি ও মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের মতামত উপেক্ষার অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা, নির্বাহী প্রকৌশলী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, প্রকৃত তথ্য আড়াল করে পরিকল্পনা কমিশন ও পিএসসি সভায় মাত্র ১৬টি চলমান স্কিমের তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জুনের মধ্যেই এসব কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীদের দেওয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় এখনও প্রায় শতাধিক স্কিম চলমান রয়েছে। খুলনা জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, জেলার অন্তত ১৩টি প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব নয়। সাতক্ষীরা থেকে প্রায় অর্ধশতাধিক চলমান স্কিমের অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। বাগেরহাট থেকেও একই ধরনের তথ্য পাঠানো হয়েছে।
তবুও এসব বাস্তবভিত্তিক তথ্য উপেক্ষা করে সীমিত সংখ্যক প্রকল্পের তথ্য উপস্থাপন করায় প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্পের প্রকৃত অবস্থা গোপনের চেষ্টা হচ্ছে কি না।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রকল্প পরিচালক প্রায় সব সিদ্ধান্ত এককভাবে নিচ্ছেন। মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী, জনপ্রতিনিধি কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে এবং অনেক কাজের গতি কমে গেছে।
এক কর্মকর্তা বলেন, “মাঠের বাস্তবতা একরকম, কিন্তু কাগজে তুলে ধরা হচ্ছে ভিন্ন চিত্র। এতে পুরো প্রকল্প ব্যবস্থাপনাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।”
আরেক কর্মকর্তা জানান, শুরু থেকেই প্রকল্প পরিচালক মেয়াদ বৃদ্ধি না করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের ওপর দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ বাড়ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এত অল্প সময়ে মানসম্মতভাবে এসব কাজ শেষ করা প্রায় অসম্ভব।
এদিকে চলমান কাজ শেষ করতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরাও। সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইজ্জত উল্ল্যাহ প্রধান প্রকৌশলীর কাছে পাঠানো এক ডিও পত্রে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই ধরনের সুপারিশ করেছেন খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্যও।
জানা যায় , এসব সুপারিশ প্রধান প্রকৌশলী পরিকল্পনা কমিশন ও প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠিয়েছেন। তবে অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক এসব সুপারিশকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না।
আরও একটি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে অর্থ বরাদ্দ নিয়ে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, আগামী অর্থবছরের জন্য প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও এর মধ্যে ২০ কোটি টাকা প্রকল্প পরিচালকের নিজ জেলা কুষ্টিয়ার একটি প্রকল্পে স্থানান্তর করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
চলমান স্কিমের একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন, তারা বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করছেন। সময়ের তুলনায় কাজ অনেক বেশি বাকি থাকলেও প্রশাসনিক চাপ, বিল জটিলতা এবং অনুমোদন নিয়ে তারা আতঙ্কে রয়েছেন।
এক ঠিকাদার বলেন, “কাজ শেষ না হলেও বিল নিয়ে সমস্যা হবে কি না, সেটি নিয়ে আমরা শঙ্কায় আছি। প্রকল্প পরিচালকের দপ্তরে গেলেই চাপের মুখে পড়তে হয়।”
আরেক ঠিকাদার বলেন, “অনেক জায়গায় অতিরিক্ত শ্রমিক ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে কাজের গতি বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এত কম সময়ে মান বজায় রেখে কাজ শেষ করা সম্ভব নয়।”
টিএ