অস্ট্রেলিয়ায় ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে ডিপথেরিয়া
ছবি: সংগৃহীত
০৪:৩১ এএম | ২৪ মে, ২০২৬
অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম অঞ্চলের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ ডিপথেরিয়া। একে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ডিপথেরিয়া প্রাদুর্ভাব হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে এরইমধ্যে চারটি রাজ্যে একে অপরের সাথে সম্পর্কহীন অনেক রোগীর সন্ধান মিলেছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকারের ধীরগতির পদক্ষেপ এবং উদাসীনতা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা মহলে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
উদ্বেগজনক এই প্রাদুর্ভাবের কথা প্রথম প্রকাশ্যে আসে গত মার্চের শেষের দিকে। নর্দার্ন টেরিটরির প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং সেন্ট্রাল অস্ট্রেলিয়ান অ্যাবোরিজিনাল কংগ্রেসের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডক্টর জন বোফা জানান, প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার বেশ কয়েক মাস পর তারা বিষয়টি জানতে পেরেছেন। ততদিনে নর্দার্ন টেরিটরির স্বাস্থ্য বিভাগ ত্বকের ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত ৩৭ জন রোগীকে শনাক্ত করেছিল। মূলত গত বছরের মে মাস থেকেই ছড়াচ্ছিল এই রোগ। এর পাশাপাশি ডারউইন ও অ্যালিস স্প্রিংসে চারজন মারাত্মক ও প্রাণঘাতী শ্বাসতন্ত্রের ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়।
চিকিৎসকদের মতে, বিভিন্ন রাজ্যে যখন কোনো পারস্পরিক যোগসূত্র ছাড়াই এই রোগের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছিল, তখনই বোঝা গিয়েছিল যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। বিচ্ছিন্ন রোগী পাওয়ার অর্থই হলো রোগটি চারপাশেই ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর জন্য দ্রুত ব্যাপকভিত্তিক পদক্ষেপের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে চিকিৎসাকর্মীরা দেখেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই রোগের ভয়াবহতা, টিকাদান পদ্ধতি বা বুস্টার ডোজ নেওয়ার বিষয়ে ন্যূনতম সচেতনতা নেই। প্রয়োজনীয় তথ্যেরও অভাব ছিল।
প্রাথমিক পর্যায়ে সচেতনতার অভাবের পাশাপাশি টিকার তীব্র সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মে মাসের দিকে প্রতি সপ্তাহে ১৫ থেকে ২০ জন নতুন রোগী শনাক্ত হতে শুরু করে। অথচ রয়্যাল ডারউইন হাসপাতালে মাত্র একটি ল্যাবরেটরি থাকায় পরীক্ষার ফলাফল আসতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লেগে যাচ্ছিল। পরবর্তীতে টিকার সংকট কেটে গেলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘরে ঘরে গিয়ে টিকা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী ও জরুরি চিকিৎসাদলের অভাবে কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াজুড়ে এই প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তের সংখ্যা ২৩০ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া, সাউথ অস্ট্রেলিয়া ও কুইন্সল্যান্ডে বহু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রোগীকে গুরুতর শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।
আক্রান্তদের সিংহভাগই আদিবাসী প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। এই সংকটের পেছনে আদিবাসী পল্লীগুলোর অতিরিক্ত জনাকীর্ণ বাসস্থান ও নিম্নমানের জীবনযাত্রাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শিশু ও কিশোর-কিশোরীও এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
হালস ক্রিকের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলের আদিবাসী স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহীরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে ডিপথেরিয়া প্রায় নির্মূল হয়ে থাকায় মানুষ এর লক্ষণগুলো ভুলে গেছে। অনেক আদিবাসী পরিবার বাড়িতে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী ভাষায় কথা বলায় সঠিক স্বাস্থ্যবার্তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তার ওপর কোভিড-পরবর্তী সময়ে টিকাদানের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল এবং জনবল সংকটের কারণে রোগ ছড়ানোর উৎস খুঁজে বের করার মতো জরুরি কাজগুলো মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে, মে মাসের মাঝামাঝিতে নর্দার্ন টেরিটরিতে ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এক দশকের মধ্যে প্রথম এক ব্যক্তির মৃত্যুর খবর আসলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যদিও মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে, তবে এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ চিকিৎসা কর্মকর্তারা অভিযোগ করেন, জনস্বাস্থ্যের যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রথম থেকেই কঠোর ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। তারা মনে করেন, প্রাদুর্ভাবের শুরুতে শুধু ত্বকের ডিপথেরিয়া দেখা দেওয়ায় প্রশাসন একে হালকাভাবে নিয়েছিল, যা পরবর্তীতে মারাত্মক রূপ ধারণ করে।
পরিস্থিতি বিবেচনা করে ফেডারেল সরকার প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় ৭.২ মিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিল ঘোষণা করেছে। এই অর্থ মূলত অতিরিক্ত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, দ্রুত টিকা সংগ্রহ এবং অ্যান্টিবায়োটিক সরবরাহে ব্যয় করা হবে। চিকিৎসকদের আশা, এই নতুন তহবিলের সঠিক ব্যবহার, প্রাপ্তবয়স্কদের বুস্টার ডোজের হার বৃদ্ধি এবং নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে আগামী দিনগুলোতে এই মারাত্মক প্রাদুর্ভাব কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এমআর/টিএ