সেই সেনেগাল কীভাবে এবারের বিশ্বকাপের ‘ডার্ক হর্স’ হয়ে উঠল?
ছবি: সংগৃহীত
০১:৫৯ এএম | ২৮ মে, ২০২৬
ফুটবল বিশ্বকাপের আসন্ন আসরসহ এখন পর্যন্ত মেগা টুর্নামেন্টে কেবল পাঁচ বারই খেলার সুযোগ পেয়েছে আফ্রিকান দল সেনেগাল। সেরা অর্জন বলতে একবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গিয়েছিল। সেই দলটাই এবার স্বপ্ন বুনছে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটা ঘরে তোলার। অবশ্য সেই স্বপ্ন দেখার যথেষ্ট যুক্তিও আছে তাদের।
আসন্ন বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে কোনো ম্যাচ না হেরেই টুর্নামেন্টে জায়গা করে নিয়েছে সেনেগাল। নিজেদের খেলা সর্বশেষ ১০ ম্যাচের মধ্যে তারা হেরেছে কেবল একটিতে। আফ্রিকা সেরার টুর্নামেন্ট আফকনের মুকুটও জিতেছিল তারাই। তবে টুর্নামেন্ট জয়ের অনেকদিন পর আফকন সেই ম্যাচের বিজয়ী ঘোষণা করে মরক্কোকে। ওই টুর্নামেন্ট চলাকালে নিজেদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১২ নম্বর র্যাঙ্কিংয়ে চলে এসেছিল সেনেগাল। এখন আছে ১৫ নম্বরে। সব মিলিয়ে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের সেরা সময় পার করছে সেনেগাল।
সেনেগালের এই প্রজন্মকে অনেকেই বলছেন তাদের ইতিহাসের সোনালী প্রজন্ম। ইতোমধ্যে টুর্নামেন্টের ডার্ক হর্স খেতাব পেতে শুরু করেছে তারা। দলে আছেন সাদিও মানে, কালিদু কুলিবালি, অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ইদ্রিসা গানা গেয়ে এবং গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মেন্দি। তাদের অনেকেরই এটা শেষ বিশ্বকাপ। তাদের জন্যও এটি নিজেদের মেলে ধরার শেষ সুযোগ।
রাকঢাক না রেখে তাই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বোনার কথা জানিয়ে দিয়েছেন সেনেগালের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধান কোচ পাপে থিয়াও। সম্প্রতি আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'আমরা শুধু বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার জন্য যাচ্ছি না। সেনেগাল এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বিশ্বজয়। আমাদের সেই প্রতিভা এবং বিশ্বাস আছে। আমাদের এই সোনালী প্রজন্মের খেলোয়াড়দের জন্য এটাই সেরা সময় আফ্রিকার ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যাওয়ার।'

দেশটির সাম্প্রতিক সাফল্যের আরেকটি বড় কারণ হলো ইউরোপে, বিশেষ করে ফ্রান্সে বেড়ে ওঠা সেনেগালি বংশোদ্ভূত তরুণ প্রতিভাদের দলে ভেড়ানো। ফ্রান্সের অনূর্ধ্ব-২০ দলে খেলা পিএসজির ১৮ বছর বয়সী উইঙ্গার ইব্রাহিম এমবায়ে এবং চেলসির ২০ বছর বয়সী ডিফেন্ডার মামাদু সারের মতো প্রতিভাদের ফ্রান্সের রাডার থেকে ছিনিয়ে এনে সেনেগাল জাতীয় দলে খেলিয়েছে দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। তবে সেনেগালের এই বড় দল হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে আফ্রিকার ফুটবলের এক নির্মম আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার গল্পও।
মাত্র ২ কোটি জনসংখ্যার দেশ হয়েও সেনেগাল থেকে যেভাবে বিশ্বমানের ফুটবলার উঠে আসছে, বিস্ময়কর। 'জেনারেশন ফুট' এবং 'ডায়াম্বার্স'-এর মতো বিশ্বমানের স্থানীয় অ্যাকাডেমিগুলো এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। ফরাসি ক্লাব এফসি মেটজ-এর মতো ইউরোপীয় ক্লাবগুলো এই অ্যাকাডেমিগুলোতে প্রাথমিক বিনিয়োগ করে খুব সস্তায় সেরা প্রতিভাদের ইউরোপে নিয়ে যায়। তবে এই প্রক্রিয়ার পেছনে লুকিয়ে আছে নিউ কলোনিয়ালিজমের মতো বিষয়।
তথ্যমতে, সেনেগালের অ্যাকাডেমি থেকে উঠে আসা ১৩ জন খেলোয়াড়কে দলবদল বাবদ স্থানীয় অ্যাকাডেমিগুলো পেয়েছিল মাত্র ১ লাখ ১৬ হাজার ডলার। অথচ ইউরোপের ক্লাবগুলো তাদের পরবর্তীতে অন্যান্য বড় ক্লাবে বিক্রি করে ৮ কোটি ১২ লাখ ডলার আয় করেছে। পরবর্তীতে এই খেলোয়াড়দের পুরো ক্যারিয়ারের মোট ট্রান্সফার ফি ৪১ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
এই বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সেনেগালের শীর্ষ ক্লাবগুলোর একটির কর্মকর্তা মুস্তফা কামারা আল জাজিরাকে বলেন, 'ইউরোপের ক্লাবগুলো আমাদের দেশে আসে শিকারির মতো। তারা আমাদের অ্যাকাডেমিগুলো থেকে পানির দরে আমাদের সেরা প্রতিভাদের তুলে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে সেই খেলোয়াড়দের কোটি কোটি ডলারে বিক্রি করে তারা ধনী হচ্ছে, আর আমাদের স্থানীয় ক্লাবগুলো টিকে থাকার জন্য প্রতিদিন লড়াই করছে।
আমাদের স্টেডিয়ামগুলোর অবস্থা জরাজীর্ণ, স্থানীয় লিগে স্পন্সর নেই। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী আমাদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সেই টাকা তুলতেই আমাদের বছরের পর বছর লেগে যায়। এটা ফুটবলীয় শোষণ ছাড়া আর কিছুই নয়।'
এমআই/টিএ