প্রেমিকের সঙ্গে ক্যাফেতে বসে বাগদত্তাকে হত্যার ছক কষেন তরুণী
ছবি: সংগৃহীত
০৬:১৩ পিএম | ২৪ জুন, ২০২৬
হবু স্বামীকে হত্যার অভিযোগে ভারতের মহারাষ্ট্রে এক তরুণীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করলেও তদন্তে তার বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রেমিক চেতন বাবুলাল চৌধুরীর (২২) সঙ্গে একটি ক্যাফেতে দেখা করে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন ওই তরুণী।
এনডিটিভি জানিয়েছে, নিহতের নাম কেতন আগারওয়াল (২৬)। তিনি পুনের একটি রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য ছিলেন। গত ফেব্রুয়ারিতে সিয়া গোয়ালের সঙ্গে তার বাগদান হয়। আগামী নভেম্বরে তাদের জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। ঘটনার পর সিয়া গোয়াল কেতনের পরিবারকে জানিয়েছিলেন, ট্রেকিংয়ের সময় তিনি পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলেন।
হত্যার আগে একাধিক ব্যর্থ চেষ্টা
তদন্তে জানা গেছে, কেতনকে লোহাগড় দুর্গে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা বারবার করেছিলেন সিয়া। সহ্যাদ্রি পর্বতমালায় অবস্থিত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৩০০ ফুট উঁচু এই দুর্গে গত ৩১ মে একসঙ্গে ঘুরতে গিয়েছিলেন তারা। ওই সফরের কয়েক দিন পরই সিয়া আবারও সেখানে যাওয়ার জন্য কেতনকে চাপ দিতে শুরু করেন। তবে কেতনের মা অনুমতি না দেওয়ায় সে সময় তাদের দ্বিতীয়বারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
পরে ১৪ জুন আবারও দুর্গে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন সিয়া এবং এবার কেতন রাজি হন। সেদিন সিয়া তাকে পাহাড়ের কিনারা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে কেতন একটি ঝোপ আঁকড়ে ধরে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন। কেতন যখন জানতে চান কেন তাকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল, তখন সিয়া একটি সাপ দেখার মিথ্যা আতঙ্ক তৈরি করেন এবং এমনভাবে পরিস্থিতি উপস্থাপন করেন যেন তিনিই কেতনকে রক্ষা করেছেন।
হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন
তদন্তকারীদের দাবি, ১৮ জুন সকালে পুনের একটি ক্যাফেতে দেখা করে সিয়া ও চেতন কেতনকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। লোহাগড় দুর্গের কোন কোন স্থান থেকে তাকে খাদে ফেলে দেওয়া সম্ভব, সে বিষয়েও তারা বিস্তারিত আলোচনা করেন। পরে বিকেলে সিয়া কেতনকে নিয়ে আবারও দুর্গে যান। একই সময়ে চেতনও গোপনে তাদের অনুসরণ করে ট্রেকিংয়ে অংশ নেন। পাহাড়ি এই পথ অতিক্রম করতে সাধারণত তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগে।
ট্রেকিং চলাকালে চেতন হাতের ইশারার মাধ্যমে সিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা যায়, নিজের পরিচয় গোপন করতে তিনি একটি হুডি পরে ছিলেন এবং দম্পতিকে অনুসরণ করছিলেন। পুলিশের অভিযোগ, একপর্যায়ে সিয়া ও চেতন পেছন দিক থেকে কেতনকে ধাক্কা দিয়ে গভীর খাদে ফেলে দেন।
কীভাবে ধরা পড়লেন চেতন
সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করতে গিয়ে পুলিশ দেখতে পায়, শর্টস ও হুডি পরিহিত এক ব্যক্তি কেতন ও সিয়াকে অনুসরণ করছেন। ওই ব্যক্তি হুডির ওপর একটি হেডসেটও পরে ছিলেন।
আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সিয়া হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে হুডি পরা ব্যক্তির দিকে নজর দেন। সঙ্গে সঙ্গেই ওই ব্যক্তি নিচে বসে পড়েন।
পুলিশ ১৮ জুন ওই সময়ের আবহাওয়ার তথ্যও যাচাই করে। তারা দেখতে পায়, সেদিন তাপমাত্রা ছিল ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এত গরমের মধ্যে কেউ কেন হুডি পরে থাকবে, তা নিয়েও তাদের সন্দেহ তৈরি হয়। এছাড়া কেতনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানতে পারে, সিয়া বারবার কেতনকে লোহাগড় দুর্গে বেড়াতে যাওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। এতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে সিয়া ও চেতনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের প্রমাণ পাই আমরা। এরপর চেতনের ছবি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল খতিয়ে দেখা হয়। সেসব ছবি দুর্গ এলাকায় ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজের হুডি পরা ব্যক্তির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পর সন্দেহের তীর চেতনের দিকেই ঘুরে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রযুক্তিগত প্রমাণ ও লোনাভালা গ্রামীণ থানা এবং স্থানীয় অপরাধ দমন শাখার (এলসিবি) গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন দল অভিযান চালিয়ে চেতন বাবুলাল চৌধুরীকে শনাক্ত ও আটক করে।’
সাত মাসে ২,০০৪ ফোনকল
তদন্তে আরও জানা যায়, গত সাত মাসে সিয়া ও চেতনের মধ্যে মোট ২,০০৪টি ফোনকল হয়েছে, যার মোট সময়কাল ছিল প্রায় ২৩৮ ঘণ্টা। গত বছরের দীপাবলি উৎসবে একটি পার্টিতে তাদের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
তদন্তে আরও জানা গেছে, বিয়ের আগে নির্ধারিত বালি সফরের আগেই কেতনকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন সিয়া ও চেতন। প্রাক-বিবাহ ফটোশুটের জন্য কেতন ও সিয়ার বালিতে যাওয়ার কথা ছিল। তবে কেতনের পাসপোর্ট রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত সেই সফর বাতিল হয়ে যায়। তদন্তকারীদের ধারণা, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সময় ও সুযোগ তৈরির অংশ হিসেবেই ঘটনাগুলো ঘটানো হয়েছিল।
এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদের সময় চেতনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তারা পালিয়ে যাওয়ার কথা না ভেবে কেন কেতনকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। উত্তরে তিনি জানান, সিয়া বাগদান ভেঙে চেতনের সঙ্গে পালিয়ে যেতে রাজি ছিলেন না। কারণ তার আশঙ্কা ছিল, এতে পরিবারের অসম্মান হবে।’
এ ঘটনায় সিয়া গোয়াল ও চেতন বাবুলাল চৌধুরী- দুজনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এসএ/এসএন