মালদ্বীপে ভারতীয় সেনা থাকবে না, সাদা পোশাকেও নয়: মুইজ্জু
ছবি: সংগৃহীত
১০:২২ পিএম | ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
মালদ্বীপে আগামী ১০ মে’র পর কোনো ভারতীয় সামরিক সদস্য থাকবেন না বলে দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু। এমনকি ভারতীয় সেনারা পোশাক পরিবর্তন করে বেসামরিক নাগরিকের পরিচয়ে মালদ্বীপে অবস্থান করবেন—এমন গুঞ্জনও নাকচ করেছেন তিনি।
মালদ্বীপের সংবাদমাধ্যম এডিশন টিভির প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।
এক বক্তব্যে মুইজ্জু বলেন, ভারতীয় সামরিক সদস্যরা দেশ ছাড়ছেন না কিংবা পোশাক পরিবর্তন করে আবার ফিরে আসছেন—এ ধরনের গুজবে বিশ্বাস করা উচিত নয়।
তিনি বলেন, ১০ মে’র পর দেশে কোনো ভারতীয় সেনা থাকবে না। ইউনিফর্ম পরা অবস্থায়ও নয়, বেসামরিক পোশাকেও নয়। কোনো ধরনের পোশাকেই ভারতীয় সামরিক সদস্যরা এ দেশে অবস্থান করবেন না—আমি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এ কথা বলছি।
মুইজ্জুর এই বক্তব্য এমন এক দিনে এসেছে, যেদিন মালদ্বীপ চীনের সঙ্গে বিনামূল্যে সামরিক সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তি করেছে। চীনঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মুইজ্জু গত বছর ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মালদ্বীপ থেকে ভারতীয় সামরিক সদস্যদের প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছেন।
তিনটি বিমান প্ল্যাটফর্মে ৮৮ ভারতীয় সদস্য
মালদ্বীপে বর্তমানে তিনটি বিমান পরিচালনা প্ল্যাটফর্মে মোট ৮৮ জন ভারতীয় সামরিক সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। দুটি হেলিকপ্টার ও একটি ডর্নিয়ার উড়োজাহাজের মাধ্যমে তারা কয়েক বছর ধরে দেশটির জনগণকে মানবিক সহায়তা ও চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিবহনসেবা দিয়ে আসছেন।
গত ২ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর মালদ্বীপের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ১০ মে’র মধ্যে তিনটি প্ল্যাটফর্ম থেকে ভারতীয় সামরিক সদস্যদের সরিয়ে তাদের জায়গায় বেসামরিক কর্মী মোতায়েন করা হবে। এর প্রথম ধাপ ১০ মার্চের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা।
এরই মধ্যে গত সপ্তাহে একটি ভারতীয় বেসামরিক দল মালদ্বীপে পৌঁছে তিনটি বিমান প্ল্যাটফর্মের একটির দায়িত্ব নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
‘সামরিক সদস্যরাই বেসামরিক পোশাকে এসেছেন’—বিরোধীদের অভিযোগ
তবে মুইজ্জু সরকারের বিরোধীরা দাবি করছেন, ভারত থেকে মালদ্বীপে যেসব বেসামরিক কর্মী পাঠানো হয়েছে, তাদের অনেকে আসলে সামরিক কর্মকর্তা, যারা শুধু ইউনিফর্ম খুলে বেসামরিক পোশাক পরেছেন। সরকার তাদের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে পারবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দলগুলো।
মালদ্বীপের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে আরো বলা হয়েছে, চিকিৎসাজনিত জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য দেশটি শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বিকল্প বিমানসেবা পরিচালনার বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে। এতে ভারতীয়দের পরিবর্তে অন্য দেশের সহায়তায় এ ধরনের সেবা চালানোর মালদ্বীপ সরকারের প্রচেষ্টার বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ক্ষমতায় এসেই ভারতকে সেনা প্রত্যাহারের দাবি
গত বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর মুইজ্জু শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মালদ্বীপ থেকে ভারতীয় সামরিক সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান। তার নির্বাচনি প্রচারণার অন্যতম প্রধান বক্তব্য ছিল ‘ইন্ডিয়া আউট’ নীতি।
৫ ফেব্রুয়ারি পার্লামেন্টে দেওয়া নিজের প্রথম ভাষণেও তিনি ভারতীয় সামরিক সদস্যদের প্রত্যাহারের বিষয়ে একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
মুইজ্জু আরো বলেন, মালদ্বীপের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করাকে তার সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের পাশাপাশি দেশের ‘বঞ্চিত দক্ষিণাঞ্চলীয় সমুদ্রসীমা’ পুনরুদ্ধারের বিষয়েও সরকার কাজ করছে বলে দাবি করেন তিনি।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মালদ্বীপ
ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মালদ্বীপ ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের লাক্ষাদ্বীপের মিনিকয় দ্বীপ থেকে দেশটির দূরত্ব মাত্র প্রায় ৭০ নটিক্যাল মাইল এবং ভারতের পশ্চিম উপকূল থেকে প্রায় ৩০০ নটিক্যাল মাইল।
ভারতের কাছে মালদ্বীপ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রতিবেশী। ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ নীতি এবং ‘সাগর’ (সাগর—সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্রোথ ফর অল ইন দ্য রিজিওন) উদ্যোগেও দেশটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
মুইজ্জু সরকারের ভারতবিরোধী অবস্থান এবং চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা তাই শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়, গোটা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনীতিতেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
সূত্র: এনডিটিভি
এমআর/টিএ