প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ২১ ব্যবসায়ী সংগঠনের বৈঠককলকারখানা আজ থেকে পাবে আগের মতোই গ্যাস-বিদ্যুৎ
ছবি: সংগৃহীত
০৮:৫৬ এএম | ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আজ মঙ্গলবার রাত থেকেই কলকারখানায় গ্যাস–বিদ্যুতের চলমান সংকট কাটবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে সরবরাহ সংকট এখনই পুরোপুরি কাটবে না বলেও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এই সংকট ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি। আপাতত চলমান সংকট শুরুর আগে বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ যে অবস্থায় ছিল সেই অবস্থায় ফিরে যাবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক এই তথ্য জানান।
সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, মেট্রো চেম্বার, আইসিসিবি, ঢাকা চেম্বার, বিটিএমএ, বিকেএমইএসহ ২১টি ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এই আলোচনায় তারা বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।
এতে ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পথরেখা’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনা দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
ফজলুল হক বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সাম্প্রতিক সংকট কাটিয়ে শিল্প কারখানায় সরবরাহ আগের অবস্থায় ফিরবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগামীকাল (মঙ্গলবার) রাত থেকেই আমাদের নতুন করে যে সংকট তৈরি হয়েছে, এর আগের যে অবস্থায় আমরা ছিলাম, গ্যাস-বিদ্যুতের ওই অবস্থায় ফিরে যেতে পারব। এটা আজ (সোমবার) অনুষ্ঠিত বৈঠকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি, সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর।’ ‘আগের অবস্থা’ বলতে কোন সময়ের পরিস্থিতি বোঝানো হয়েছে, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ফজলুল হক বলেন, ‘আগস্ট মাসে যে সংকট ঘনীভূত হয়েছে, তার আগের অবস্থায়।’
ফজলুল হক বলেন, ‘শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরের লোকজনই জ্বালানি সংকটে কমবেশি ভুগছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগামীকাল (মঙ্গলবার) রাত থেকেই গ্যাস–বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রবাহে এর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারব।
ফজলুল হক কথা বলার আগে সাংবাদিকদের বৈঠক সম্পর্কে অবহিত করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তিনি বলেন, এই অভূতপূর্ব আয়োজনের মাধ্যমে মূলত ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, শিল্পায়নের জন্য যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি রয়েছে, বিশেষভাবে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মাহদী আমিন জানান, বিদ্যুৎ–সংকট মোকাবিলায় পাঁচটি টার্মিনাল নির্মাণসহ দীর্ঘমেয়াদি কয়েকটি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত সংকট দ্রুতই সমাধান সম্ভব নয়।
মাহদী আমিন আরও বলেন, ‘গ্যাস–বিদ্যুৎ ও কয়লা থেকে একটা সমন্বিত উৎপাদনমুখী ব্যবস্থা, যেখানে আমাদের বিদ্যুতের স্বনির্ভরতা থাকবে এবং এর পাশাপাশি বিশেষভাবে সৌরশক্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’ মাহদী আমিন আরও বলেন, ‘সামনের দিনগুলোতে আমাদের বিদ্যুৎ খাত বৈচিত্র্যময় হবে এবং আমাদের জ্বালানি সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ হব।’
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকটকে ‘উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সমস্যা’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সংকট ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে সরকার সমস্যা চিহ্নিত করে পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং এখন সেগুলো বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে কাজ করছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিও উপকৃত হবে।
বর্তমান গ্যাস সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে দুর্ঘটনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্প কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে। তবে দুর্ঘটনাজনিত সমস্যাটি ইতোমধ্যে সমাধান করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করছি, ইনশাআল্লাহ, আগামীকাল (মঙ্গলবার) সন্ধ্যা থেকে গ্যাসের সরবরাহ এক-দেড় মাস আগে যে অবস্থায় ছিল, সে রকম একটা অবস্থায় ফিরে আসবে।’ ঘাটতি মোকাবিলায় তৃতীয় একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জি-টু-জি ভিত্তিতে গত এক মাসে আরেকটি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তুতি মোটামুটি সম্পন্ন করা হয়েছে। দ্রুতই এর কাজ শুরু হবে। সরকার আগামী ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তৃতীয় টার্মিনাল সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন সরকারপ্রধান।
বিদ্যুৎ খাতের সমস্যাও দীর্ঘদিনের বলে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সমস্যা পর্যালোচনা করেছে, সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসেছে এবং সেগুলো সমাধানে পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এখন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। যেকোনো কিছু পরিকল্পনা করা এবং সেটি বাস্তবায়ন করতে সময় লাগে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের এই সমস্যা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। চাইলেই ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে এর সমাধান করা সম্ভব নয়।
সভায়, সরকার কোন কাজ কখন শেষ করতে চায়, তার একটি সম্ভাব্য সময়সীমাও ব্যবসায়ী নেতাদের সামনে তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় কিছুটা এদিক-সেদিক হতে পারে। তবে সরকারের সামনে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা রয়েছে।
ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যবসা ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার সামগ্রিক প্রভাব দেশের অর্থনীতির ওপর পড়ে। ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান শুধু ব্যবসায়ীদের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সেই লক্ষ্যে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এতটুকু আমরা আপনাদের জানাতে চেয়েছি যে আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি। সে জন্য হতাশ হওয়ার মতো কারণ নেই।’
সরকারের পরিকল্পনা যৌক্তিক মনে হলে তা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে শুধু ব্যবসায়ী সম্প্রদায় নয়, পুরো দেশ উপকৃত হবে। দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
যারা উপস্থিত ছিলেন: সভায় আরও ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ, জ্বালানি সচিব মো. জিয়াউল হক।
ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে ছিলেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ, বাংলাাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কামাল, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আমিরুল হক, বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব আনাম প্রমুখ।
এ ছাড়া দৈনিক মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, বিএনপি মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ড. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, ইংরেজি দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, সাংবাদিক আশরাফ কায়সার, মোস্তাফা ফিরোজ, আব্দুন নূর তুষার, আকবর হোসেন, শাহেদ আলম, রেজাউল করিম রনি, আজিজুর রহমান রিপন, তরিকুল ইসলাম সৌরভ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহরিন ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
বিচ্ছিন্ন তথ্যে বিভ্রান্তি হতে পারে: আলোচনায় গণমাধ্যমকর্মী ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের আমন্ত্রণ জানানোর কারণও ব্যাখ্যা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা গণমাধ্যমের কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। তা না হলে বিচ্ছিন্ন তথ্য থেকে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। গণমাধ্যম সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেলে তা দেশবাসীর কাছেও সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এমআই/এসএন