৪ দশকেও গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের সংকট কাটেনি
ছবি: সংগৃহীত
১০:৪১ এএম | ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জেলার ২৭ লাখ মানুষের একমাত্র ভরসার নাম গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল। বিশেষ করে অর্থনৈতিক কারণে চিকিৎসাসেবায় যারা প্রাইভেট ক্লিনিক কিংবা দেশের নামি-দামি হাসপাতালের কথা চিন্তাই করতে পারেন না তাদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় ভরসা এই হাসপাতালটি। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ৪৩ বছরেও এটাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ রূপ দেওয়া যায়নি।
গেল ৬ বছর আগে চিকিৎসাকেন্দ্রটি ২৫০ শয্যার মর্যাদা পেলেও চলছে ১০০ শয্যার জনবল দিয়েই। এছাড়া ৪ বছর আগে ৯ তলা আধুনিক ভবনের কাজ বুঝিয়ে নেওয়া হলেও একই কারণে তা পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে জনবল-সরঞ্জাম সংকটে এখানে চিকিৎসা নিতে এসে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন অবহেলিত এ জেলার লাখ লাখ মানুষ। স্বাধীনতার ৫৬ বছরেও এ হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা যেন এখনো এক অসমাপ্ত স্বপ্ন।
চার দশক পেরিয়েও সংকটের শিকলে বন্দী
১৯৮৪ সালে মাত্র ৫০ শয্যা নিয়ে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০১৬ সালের ৬ অক্টোবর ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এছাড়া ২০১৮ সালের ৮ মে ২০০ শয্যা ও সর্বশেষ ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয় গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল। কিন্তু নামের এই উত্তরণ বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি। আজও হাসপাতালে কর্মরত জনবল এবং যন্ত্রপাতি সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে ১০০ শয্যার কাঠামোতেই।
সর্বশেষ গত ২৮ জুলাইয়ের হাসপাতলের জনবলের হালনাগাদ তথ্য বলছে, জনবল সংকট এতটাই প্রকট যে, ১০০ শয্যার হিসেবেও যেখানে চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট পদে ২০৮ জন থাকার কথা, সেখানে কর্মরত রয়েছে ১৩০ জন। শূন্য পদ ৭৮টি।
বিশেষত দীর্ঘদিন শূন্য পড়ে আছে সিনিয়র কনসালটেন্ট মেডিসিন, অতি প্রয়োজনীয় চক্ষু, কার্ডিওলোজি, অ্যানেস্থেসিয়া, চর্ম ও যৌন, এছাড়াও সিনিয়র কনসালটেন্ট ইএনটি, অর্থো সার্জারি ও জুনিয়র কনসালটেন্ট অর্থপেডিক্সসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসকদের পদগুলো। জেনারেল পদগুলোতেও রয়েছে শূন্যতা
সরেজমিনে যা দেখা গেল
গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালটিতে সরেজমিনে দেখা যায়, পুরাতন ভবনের আন্তঃবিভাগের ওয়ার্ডগুলোতে শয্যা সংকটে নিচতলা ও দোতলার বারান্দার মেঝে, কড়িডোর ও সিঁরির পাশে শয্যা পেতেছেন রোগীরা। যেন পা ফেলার বা স্বাভাবিক চলাফেরার সুযোগ নেই। একজন রোগীর সঙ্গে এসেছেন একাধিক স্বজন। অপরদিকে ভবনের মূল গেট পর্যন্ত রিকশা, অটো, ভ্যানের মতো যানবাহনের ভিড়ে স্বাভাবিক চলাফেরায় বিঘ্ন ঘটছে। এছাড়াও মাঠে গ্যারেজের নাম করে আগে একটি দোকান বসলেও এখন দুটি দোকান গড়ে তোলা হয়েছে। যেখানে প্রকাশ্যে ধূমপান করছে মানুষ।
চার বছরেও চালু হয়নি আধুনিক ভবন
প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫০ শয্যার নয় তলা হাসপাতালের আধুনিক ভবন নির্মাণ করা হয়েচে। ২০২২ সালের এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে গণপূর্ত বিভাগ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তা বুঝিয়ে দেন। অথচ ভবন বুঝে পাওয়ার চার বছরেও যন্ত্রপাতি ও জনবল না থাকায় পুরোপুরি চালু হয়নি। নতুন ভবন চালু করতে হলে চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট পদে যা আছে তার সাথে আরও প্রয়োজন ২৭১ জনের বিপুল সংখ্যাক জনবল।
নতুন ভবনে সরেজমিনে দেখা যায়, ৯ তলা আধুনিক ওই ভবনে কেবল টিকিট কাউন্টার, আউটডোর চিকিৎসা, ফার্মাসিস্টসহ আরও ২/১ একটি সেবা চালু করা হয়েছে। অবব্যবহৃতই পড়ে আছে ভবনের সিংহসভাগ অংশ।
স্বাস্থ্যসেবার বদলে রেফার্ডই রুটিন
আন্তঃবিভাগ সূত্র বলছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত গত আট মাসে আন্তঃবিভগে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩৬ হাজার ১৬৭। এর মধ্যে গাইনি, শিশু, স্ক্যানু, মহিলা, পুরুষ ও ডায়রিয়াসহ কয়েকটি বিভাগ থেকে রেফার্ড করা হয়েছে ২ হাজার ৬৪৪ জন ভর্তি রোগীকে। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৩২৫ জনের। এ হিসেব কেবল আন্তঃবিভাগের। এর বাইরে জরুরি বিভাগ থেকেও যথেষ্ট পরিমাণ সংখ্যাক গুরুতর ও আশঙ্কাজনক রোগীকে প্রতিদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়ে থাকে।
জরুরি বিভাগ সূত্র বলছে, জনবল সংকটের কারণে প্রায় প্রতিদিন গড়ে ৮-১০ জন রোগীকে রেফার্ড করা হচ্ছে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তবে কোন রোগের, কত রোগী প্রতিদিন রেফার্ড করা হচ্ছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট রেকর্ড পাওয়া যায়নি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে।
হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার বীনাপানি গোলদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, চিকিৎসক সংকটে এখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রায় সব ধরনের রোগীকে রেফার্ড করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে মেডিসিন, কার্ডিয়াক, শিশু, ডায়রিয়া ও গাইনি বিভাগের রোগীদের বদলি করা হয়।
হাসপাতালের স্টোর কিপার বিষ্ণুপদ রায় বলেন, হাসপাতালে পাঁচটি অটোক্লাভ মেশিনের মধ্যে চালু রয়েছে একটি, অ্যানেস্থিসিয়া পাঁচটি মেশিনের পাঁচটিই অচল, অটো টেবিল মেশিনের তিনটি এবং অটো লাইট মেশিনের ৪টির মধ্যে অচল একটি।
এছাড়া তিনি আরও জানান, চারটি এক্সরে মেশিনের মধ্যে ১০০০ এমএ এবং ৫০০ এমএ এর দুটি এক্সরে মেশিন ও একটি আলট্রাসোগ্রামের মেশিন চালু রয়েছে।
সিনিয়র স্টাফ নার্স স্বপ্না রানী বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭১ জন নতুন ভর্তি রোগীসহ ভর্তি মোট রোগী রয়েছে ৪০১ জন। যা আমাদের জনবলের থেকে কয়েকগুণ বেশি। এতে আমরা রীতিমতো হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। চেষ্টা করেও চিকিৎসার পরিবেশ ঠিক রাখা যায় না।
আন্তঃবিভাগে সিট না পেয়ে করিডোরে আসন পাতা কিশোর তৌসিফের মা স্নিগ্ধা রহমান বলেন, বাবুর শ্বাসকষ্ট নিয়ে গতকাল আমরা ভর্তি হয়েছি। আজ অনেক ভালো। ডাক্তার দেখেছেন। নার্সরা প্রয়োজনীয় ওষুধ দিতেছেন। আসন পাইনি, রোগীতে ভরপুর। তাই মেঝেতে সিট করে দিয়েছে।
রোগীর স্বজন জাহিদুল বলেন, একেকজন রোগীর সঙ্গে ২-৩ জন করে মানুষ থাকে। ফলে অনেক চেঁচামেচি হয়। এতে পরিবেশও নষ্ট হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এসব দেখা দরকার।
নতুন ভবনের বহিঃবিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা সুমনা আক্তার বলেন, আউটডোরে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বড় পরিসরে খোলামেলাভাবে সেবা পাওয়া যায়। কিন্তু একেকজন চিকিৎসক অনেক রোগী দেখেন আর সব ওষুধ পাওয়া যায় না। বেশিরভাগ সময়ই দামি ওষুধ কিনতে হয়।
হাসপাতালের চিকিৎসক শেখ সুলতান আহমেদ সোহেল ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রতিনিয়তই রোগীর চাপ বাড়ছে। আউটডোরে প্রায় সময়ই একজন চিকিৎসককে দেড় থেকে ২০০ পর্যন্ত কখনো কখনো আরও বেশি রোগী দেখতে হচ্ছে। চিকিৎসকের যথেষ্ট সংকট রয়েছে। জনবল নিয়োগ করা হলে সেবার মান উন্নয়ন সম্ভব।
গাইবান্ধার পরিবেশ আন্দোলনের আহ্বায়ক গোলাম রব্বানী মুসা বলেন, গাইবান্ধার একমাত্র জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভঙ্গুর। এজন্য স্থানীয় রাজনীতিকরা দায়ী এবং স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। গাইবান্ধার জনগণের সুচিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। চার বছর ধরে আধুনিক ভবন পড়ে থাকবে—মানে এটি সরকারের চরম অবহেলা।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) আসিফ রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতালে জনবল আছে সেই ১০০ শয্যার হিসেবে। আমাদের চিকিৎসকের যথেষ্ট ঘাটতি। তবে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। সেবার মান উন্নত হওয়ায় সব ধরনের রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। শয্যা সংকটের কারণে আমরা জরুরি হওয়া সত্ত্বেও আলাদা আলাদা বিভাগ করতে পারছি না।
গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শহীদুল্লাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, বহুতল ভবনটি বুঝে নেওয়া হলেও জনবল এবং সরঞ্জমাদির অভাবে পুরোপুরি চালু করা যায়নি। আধুনিক ভবনটি চালু হলে সকল সংকটের সমাধান হবে বলে আশা করছি। আমরা নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়গুলো অবগত করে লিখছি।
এফআর/টিএ