বিএনপির নতুন মাফিয়াতন্ত্রের কবর রচনা করবে এনসিপি : আসিফ মাহমুদ
ছবি: সংগৃহীত
০৭:৪৭ পিএম | ৩০ অক্টোবর, ২০২৬
দেশ বর্তমানে এক ভয়াবহ সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব মো. আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
তিনি বলেন, বিএনপি সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। জুলাই সনদ তো দূরের কথা, গত ১০ বছর ধরে রাজনীতি করা ৩১ দফাও তারা ভুলে গেছে। ঢাকা শহরে নতুন করে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও মাফিয়াতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি এসব মাফিয়াতন্ত্রের কবর রচনা করবে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে চার দফা দাবিতে আয়োজিত এক গণবিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘দেশ একটা ভয়াবহ সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা আসলে কী নিয়ে কথা বলব? সর্বাঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা? এখানে যদি সমস্যা নিয়ে কথা বলা শুরু করা হয়, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে যাবে, রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে যাবে, কথা শেষ হবে না।’
তিনি বলেন, ‘আজকে আপনারা সবাই ঢাকা শহরে থাকেন। আপনারা জানেন, এই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, ভুতুড়ে বিল, বিদ্যুৎ থাকে না, গ্যাস থাকে না। এলপিজির দাম ১ হাজার ৮০০ টাকা নির্ধারণ করে ২ হাজার ৫০০ টাকা, ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। মানুষ আগে ঢাকা শহরে আসত, এখন ঢাকা শহর থেকে আবার গ্রামে ফিরে যাওয়া শুরু করেছে।’
বিএনপির সমালোচনা করে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘এই সরকার আমাদের নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি, ইশতেহার দেখিয়েছিল। নির্বাচনের পর তারা জুলাই সনদ তো দূরের কথা, যে ৩১ দফা নিয়ে গত ১০ বছর ধরে রাজনীতি করে আসছে, ওই ৩১ দফাও তারা ভুলে গেছে। জনগণের সঙ্গে তো প্রতারণা করেছেই, নিজ দলীয় নেতাকর্মী, যাদের ৩১ দফা, গণতন্ত্রের কথা বলে, সংস্কারের কথা বলে আন্দোলন-সংগ্রামে নিয়ে এসেছিল, ভোট নিয়ে এসেছিল, তাদের সঙ্গেও বেইমানি করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেই নেতাকর্মীরা আন্দোলন-সংগ্রাম করল, নির্বাচনে কাজ করল, তাদের এখন দূরে ঠেলে দিয়ে হত্যা করে নেপোকিডদের রাজত্ব শুরু হয়েছে। যারা অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করেছে, যারা ফ্যাসিবাদের সময় সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে, ফ্যাসিবাদের সময় বাপের পরিচয় দেয় নাই। কিন্তু তাদের সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গে সব টেন্ডার, সব কাজে, সব জায়গায় তারা বাপের পরিচয় দিয়ে বসে গেছে।’
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘এই নেপোকিডদের বিরুদ্ধে সেই দিন আর দূরে নাই, যেদিন বিএনপির মাঠপর্যায়ের ত্যাগী নেতাকর্মীরা, যারা গণঅভ্যুত্থানে গুলি খেয়েছেন, আমাদের সঙ্গে ছিলেন, সেদিন তারা আবারও আমাদের মিছিলে এসে একত্রিত হবেন।’
ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘গতকালকে আমরা দেখেছি, ঠাকুরগাঁওয়ে একটা উপনির্বাচন হয়েছে। সকাল থেকে আমরা দেখলাম বিভিন্ন জায়গায় প্রিসাইডিং অফিসাররা ব্যালটে সিল মেরে রেখেছেন, সেগুলো ধরাও খেয়েছে। অথচ অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমরা দেখি সরকারি প্রার্থী, তারপরে বিরোধী প্রার্থী, তারা একে অপরকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন। আমাদের গণতন্ত্রের খুবই সংকটময় এবং দুরবস্থার একটি সময় পার করছি।’
তিনি বলেন, ‘এই মিষ্টি খাওয়ার চিত্র এটাই পুরো দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট করেছে, কেন বাংলাদেশের আগামী রাজনীতিতে জাতীয় নাগরিক পার্টিকে দরকার। কেন বাংলাদেশে একটা আপসহীন শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দল দরকার। কেন বাংলাদেশে আগামী দিনে আপনারা যারা এখানে এসেছেন, তাদের দ্বিগুণ, তিন গুণ হয়ে রাজপথে নামা দরকার।’
এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ বুঝে যাচ্ছে, বাংলাদেশে এনসিপি ছাড়া গণতন্ত্রের জন্য, সুশাসনের জন্য, একটি শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতির জন্য আর কোনো বিকল্প নাই। আজকে আপনারা এখানে যারা এসেছেন, আপনাদের আগামী দিনে দ্বিগুণ, তিন গুণ, চার গুণ, ১০ গুণ হতে হবে। আপনাদের এই সাংগঠনিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়েই জাতীয় নাগরিক পার্টি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই ক্ষমতায় যাওয়ার উপযুক্ত হবে, ইনশাল্লাহ।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রশাসকদের অংশগ্রহণের বিরোধিতা করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘ঢাকা শহরে, সারা দেশে বিএনপি আসার পরে যেসব লোক জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন, যেসব লোক নির্বাচনে জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, তাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এখন আমরা শুনছি, এসব অবৈধ, অগণতান্ত্রিক প্রশাসক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘তারা সিটি করপোরেশনের টাকা দিয়ে, সিটি করপোরেশনের লোগো দিয়ে পুরো ঢাকা শহর পোস্টারে, ব্যানারে ছেয়ে ফেলেছে। সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের কাজ হচ্ছে ঢাকা শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। অথচ তারা ঢাকা শহর তাদের পোস্টার-ব্যানার দিয়ে নোংরা করে ফেলেছে। এসব প্রশাসককে কোনোভাবেই আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া যাবে না।’
ঢাকায় উচ্ছেদের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘তারা দলীয় গুন্ডাবাহিনী নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় উচ্ছেদের নামে নতুন করে চাঁদাবাজির এস্টাবলিশমেন্ট খুলে বসছে। সকালবেলা মিছিল নিয়ে গিয়ে উচ্ছেদ করে, বিকেলবেলা তাদের নেতাকর্মীরা ওই উচ্ছেদ হওয়া লোকদের সঙ্গে বসে বলে, আগে ৫০০ দিতে, এখন ২ হাজার দিলে আবার বসতে দেব।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা শহরে তারেক রহমান চাঁদাবাজির যে নতুন সাম্রাজ্য বা মাফিয়াতন্ত্র গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি উত্তরে আমিনুল ও মিল্টনের মতো ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিয়েছেন। একইভাবে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণে নতুন করে ঢাকা-৯-এর সংসদ সদস্য কিংবা আব্দুস সালামদের নিয়ে আসছেন। ঢাকা শহরে নাকি পুরোনো যারা মাফিয়া ছিলেন, তাদের বয়স হয়ে গেছে, তারা এখন হুইলচেয়ারে চলে গেছেন। তারা একটু পুরোনো ধ্যানধারণার, পুরোনো চিন্তার। এই জন্য তারেক রহমানের নতুন মাফিয়া লাগবে, যারা জনগণের চোখে একই দিকে ধুলা ছুড়তে পারবে, আরেকদিকে মাফিয়াতন্ত্র, সন্ত্রাস, খুন, চাঁদাবাজি করতে পারবে।’
এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি ঢাকা শহরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঢাকা শহরে এসব মাফিয়াতন্ত্রের কবর রচনা করবে। এখানে আমাদের বিভিন্ন ওয়ার্ডের নেতৃবৃন্দ আছেন, ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীরা আছেন। আগামী দিনে আমরা শক্তিশালী হয়ে এই মাফিয়াতন্ত্রের কবর রচনা করে ঢাকাকে জনগণের জন্য একটি সুন্দর নগরীতে পরিণত করব।’
আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সরকারের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই দেখা যাবে, ঢাকা শহরের জনগণ এই গ্যাস, তেল, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা অবৈধ প্রশাসক, অবৈধ সরকারের পক্ষে ভোট দেবেন, নাকি জনগণের প্রতিনিধিদের ভোট দেবেন। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই দেখা যাবে, যারা রাড্ডার মতো ক্লিনিক ঘুরিয়ে দিয়েছে, যারা চাঁদাবাজির মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে, যাদের হাত থেকে ফুটপাত পর্যন্ত রক্ষা পায়নি, জনগণ কি তাদের ভোট দেবে, নাকি এখানে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের প্রকৃত প্রতিনিধিদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে?’
এমআই/টিএ