© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

ইউক্রেনকে আত্মসমর্পণের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন ট্রাম্প?

শেয়ার করুন:
ইউক্রেনকে আত্মসমর্পণের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন ট্রাম্প?

ছবিঃ সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৯:২১ এএম | ০৫ মার্চ, ২০২৫
সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এ ঘটনার পর থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল, ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা স্থগিত হতে পারে।

অবশেষে সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, আপাতত ইউক্রেনকে কোনো সামরিক সহায়তা দেওয়া হবে না। পাশাপাশি, ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পরিকল্পনাও করছে তারা।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তের পর গতকাল মঙ্গলবার জেলেনস্কি এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ইউক্রেনে টেকসই শান্তির লক্ষ্যে তিনি ট্রাম্পের শক্তিশালী নেতৃত্বে কাজ করতে চান। ওয়াশিংটনের সঙ্গে খনিজ চুক্তি করতেও তিনি প্রস্তুত আছেন।

দীর্ঘ তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৬৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা পেয়েছে ইউক্রেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই সহায়তা দিয়েছিলেন। গত ডিসেম্বরে ক্ষমতা ছাড়ার আগে কিয়েভের জন্য আরও ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র, সামরিক যান ও অন্যান্য সরঞ্জাম অনুমোদন দেন বাইডেন।

মূলত সেই অস্ত্র ও সরঞ্জামগুলোর চালান স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এদিকে প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে জানান, অস্ত্রগুলোর চালান পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি, সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরোনো চালানের যেসব অস্ত্র ইউক্রেনে যাচ্ছিলো, তার সবই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা হবে। যেসব অস্ত্র এরই মধ্যে সরবরাহের জন্য উড়োজাহাজে তোলা হয়েছে এবং পোল্যান্ডের ট্রানজিট এলাকায় জাহাজে মজুত রয়েছে। সেগুলোও ফেরত আনার কথা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে অস্ত্রের এই চালান স্থগিত করতে নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। ওই নির্দেশের পর হেগসেথের সঙ্গে আলোচনায় বসেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড ও ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ। এরপর ইউক্রেনে অস্ত্রসহায়তা স্থগিত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এদিকে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউসে মুখোমুখি বৈঠকে বসেন ট্রাম্প ও জেলেনস্কি। শুরুর দিকে সেই আলোচনা ভালোভাবে চললেও এক পর্যায়ে দুজনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। এরপর জেলেনস্কি ও তার দলকে ওভাল অফিস ছেড়ে যেতে বলেন মার্কিন কর্মকর্তারা। সেদিন দুই দেশের মধ্যে খনিজ সম্পদবিষয়ক একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা আর আলোর মুখ দেখেনি।

এদিকে এই ঘটনার পরও ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন জেলেনস্কি। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স হ্যান্ডলে তিনি লেখেন, ইউক্রেনে টেকসই শান্তির জন্য তিনি ও তার দল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শক্তিশালী নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠক যেভাবে এগোনোর কথা, সেভাবে এগোয়নি। এটা ঠিক করার এখনই সময়। জেলেনস্কি আরও লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউক্রেনের খনিজ সম্পদ নিয়ে চুক্তি করতে কিয়েভ প্রস্তুত রয়েছে। যেকোনো সময় ও যেকোনো উপযুক্ত কাঠামোয় সেই চুক্তি করতে ইউক্রেন রাজি রয়েছে।

এর আগে ইউক্রেন মার্কিন সামরিক সহায়তা স্থগিতের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। জেলেনস্কির এক্স বার্তার আগে ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রি জাগোরোদনিয়ুক অভিযোগ আনেন, মস্কোর পাশবিক শর্তের ভিত্তিতে তৈরি একটি খারাপ শান্তিচুক্তি মেনে নিতে ভলোদিমির জেলেনস্কির ওপর জোর খাটাচ্ছে হোয়াইট হাউস। কিয়েভ যদি এই চুক্তিতে রাজি না হয়, তাহলে মার্কিন সামরিক সহায়তা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এদিকে ইউক্রেনের পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রধান ওলেকসান্দ্র মেরেঝকো মনে করেন, ট্রাম্প ইউক্রেনকে আত্মসমর্পণের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, এখন অস্ত্রসহায়তা বন্ধের মানে হচ্ছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সহায়তা করা। ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার দাবিগুলো মেনে নেওয়ার চাপ দিচ্ছেন।

এদিকে এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতে ইউরোপের প্রতিরক্ষা খাতকে শক্তিশালী করতে এবং সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় ৮০০ বিলিয়ন পাউন্ডের একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন। গতকাল ব্রাসেলসে ‘ইউরোপকে নতুন করে অস্ত্র সজ্জিতকরণ’ নামের পরিকল্পনা সম্পর্কে উরসুলা বলেন, ‘এটি ইউরোপের সময়। আমরা সামনে এগিয়ে যেতে প্রস্তুত।’

যুক্তরাষ্ট্র মূলত এমন একটি পরিকল্পনা করছে যাতে তারা রাশিয়াকে নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মস্কোর সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক চালু এবং ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি চাওয়ায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন।

এদিকে বিভিন্ন বৈশ্বিক গণমাধ্যমগুলোর সূত্র থেকে জানা গেছে, ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কোন্নয়নে মস্কোর সঙ্গে বড় পরিসরে আলোচনা শুরু করতে চায়। তার অংশ হিসেবে আগামী দিনগুলোতে মার্কিন কর্মকর্তারা যেন রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে যেসব নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা যায়, সেগুলোর একটি তালিকা তৈরি করতে নির্দেশ দিয়েছে হোয়াইট হাউস।

যদিও গত বছর ক্রেমলিন জো বাইডেন প্রশাসনের অধীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ‘শূন্যের নিচে’ বলে উল্লেখ করেছিলো। ডেমোক্র্যাট নেতা বাইডেন অস্ত্র ও অর্থসহায়তা দিয়ে ইউক্রেনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সঙ্গে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার ইউক্রেনে অভিযান চালানোর শাস্তি হিসেবে বাইডেন প্রশাসন দেশটির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলো।

ট্রাম্প এসে যেনো বাইডেনের ভুলগুলোই ধরিয়ে দিচ্ছেন এমনটি মনে করছেন মার্কিন বিশ্লেষকরা। আবার কেউ কেউ দাবি করছেন পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের ভালো সম্পর্ক থাকাটিকে প্রভাব হিসেবে খাটাতে চাইছে ওয়াশিংটন। ট্রাম্প নিজের বক্তব্যে অবশ্য এরকম এক বার্তা দিয়েছেন।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় চলাকালে ট্রাম্প বলেন, বাইডেন বা তার প্রশাসনকে মস্কো সম্মান না জানালেও তাকে এবং তার বর্তমান প্রশাসনকে তারা সম্মান দেখিয়েছেন। এজন্য তিনি নিশ্চিত যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি তিনিই কার্যকর করতে পারবেন।

মন্তব্য করুন