© bangladeshtimes.com সকল অধিকার সংরক্ষিত ২০২১-২০২২।

১৭০ বছর পর আবারও বন্ধ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, দেউলিয়া ঘোষণা

শেয়ার করুন:
১৭০ বছর পর আবারও বন্ধ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, দেউলিয়া ঘোষণা

ছবি: সংগৃহীত

মোজো ডেস্ক
০৪:০০ এএম | ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
একসময় ভারত শাসন করা এবং ব্রিটিশ উপনিবেশ বিস্তারের পথ তৈরি করা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পুনরুজ্জীবনের প্রায় ১৭০ বছর পর আবারও বন্ধ হয়ে গেছে। যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে বিলাসপণ্য বিক্রির প্রতিষ্ঠান হিসেবে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত দেউলিয়া হয়ে কার্যক্রম গুটাতে হয়েছে ঐতিহাসিক এই কোম্পানিকে। আর এর মধ্য দিয়ে এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনেরও সমাপ্তি ঘটল।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলছে, একসময় ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করা এবং ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের পথ তৈরি করা ব্রিটিশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আবারও বন্ধ হয়ে গেছে। এবার লন্ডনে বিলাসপণ্যের খুচরা বিক্রেতা হিসেবে তাদের কার্যক্রমের ইতি টানা হলো। অবশ্য মূল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রায় ১৫২ বছর আগে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।

পরে ২০১০ সালে এক ব্রিটিশ-ভারতীয় ব্যবসায়ী নামের স্বত্ব কিনে প্রতিষ্ঠানটি পুনরুজ্জীবিত করেন। কিন্তু সেই প্রকল্প এবার দেউলিয়া হয়ে শেষ হয়েছে। ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক সিপাহি বিদ্রোহের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে ভারতের শাসনভার ব্রিটিশ সরকারের হাতে চলে যায়। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ ক্রাউন সরাসরি ভারতের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং এর মাধ্যমে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সূচনা হয়।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্তরাধিকার সাধারণত নেতিবাচক অর্থেই দেখা হয়। ভারত ও এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে ব্যাপক শোষণ, সহিংসতা এবং মহাদুর্ভিক্ষ, বিশেষ করে বাংলার মহাদুর্ভিক্ষের সঙ্গে এই কোম্পানির নাম জড়িত। পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল। যদিও ব্রিটিশ এই কোম্পানি বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় পরিবর্তন এনেছিল। কিন্তু বিপুল মানবিক দুর্ভোগের বিনিময়েই এই পরিবর্তন এসেছিল।

২০১০ সালে ভারতীয় উদ্যোক্তা সঞ্জীব মেহতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামের সত্ত্বাধিকার কিনে নেন। যে কোম্পানি একসময় ভারত শাসন করেছে, সেটির মালিক একজন ভারতীয় হওয়ার সেই খবর বিশ্বজুড়ে শিরোনাম হয়েছিল। তবে কোম্পানিটির আধুনিক সংস্করণ এখন লিকুইডেশনে গেছে।

দ্য সানডে টাইমস জানিয়েছে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লিমিটেড ২০২৫ সালের অক্টোবরে লিকুইডেটর নিয়োগ দেয়। ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত তাদের মূল প্রতিষ্ঠানের কাছে ৬ লাখ পাউন্ডের বেশি দেনা ছিল। কর বাবদ বকেয়া ছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৮৯ পাউন্ড এবং কর্মীদের পাওনা ছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ১০৫ পাউন্ড। মালিক সঞ্জীব মেহতার সঙ্গে যুক্ত ‘ইস্ট ইন্ডিয়া’ নামধারী আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও বিলুপ্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

এছাড়া কোম্পানির ওয়েবসাইটও বর্তমানে অচল। লন্ডনের মেফেয়ারে ৯৭ নিউ বন্ড স্ট্রিটে তাদের দোকানটি খালি পড়ে আছে এবং ভাড়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি তোলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আরেক প্রতিষ্ঠান ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কালেকশনস লিমিটেডের বিরুদ্ধেও সম্প্রতি পাওনাদাররা উইন্ডিং-আপ পিটিশন দায়ের করেছে। ইন্ডিয়া টুডে বলছে, ২০০০-এর দশকের শুরুতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামের স্বত্ব অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেন সঞ্জীব মেহতা। ২০১০ সালে তিনি মেফেয়ারে ২ হাজার বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল দোকান খোলেন। সেখানে ফোর্টনাম অ্যান্ড ম্যাসনের মতো খ্যাতনামা দোকানের আদলে উচ্চমানের চা, চকলেট, মিষ্টান্ন, মসলা ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি হতো।

মেহতা এটিকে উপনিবেশবাদের প্রতীককে ইতিবাচক কিছুর মধ্যে রূপান্তর হিসেবে দেখেছিলেন। ২০১৭ সালে দ্য গার্ডিয়ানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘একজন ভারতীয় এখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক, এতে নেতিবাচক বিষয়টি ইতিবাচকে পরিণত হয়েছে। ঐতিহাসিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আগ্রাসনের ওপর দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু আজকের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সহমর্মিতার কথা বলে।’

মূল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর রানি প্রথম এলিজাবেথের দেয়া রাজকীয় সনদের মাধ্যমে ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। ইস্ট ইন্ডিজ তথা ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মসলা ও পণ্যের বাণিজ্যে অংশ নিতে এটি একটি যৌথ-শেয়ারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে।

এটি ছিল বিশ্বের প্রথম দিকের যৌথ-শেয়ার কোম্পানিগুলোর একটি, যেখানে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনে লাভ-ক্ষতির অংশীদার হতেন। ১৬১২-১৩ সালে ভারতের সুরাটে প্রথম বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করে এই কোম্পানি। পরে কেপ অব গুড হোপের পূর্বাঞ্চলে ব্রিটিশ বাণিজ্যে একচেটিয়া অধিকার পায়। ১৭০০-এর দশকে এটি শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। দুর্গ নির্মাণ, স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে জোট এবং ফরাসি ও বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলা অঞ্চলে শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং কর আদায়, আদালত পরিচালনাসহ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে থাকে।

উনিশ শতকের শুরুতে কোম্পানিটির প্রায় আড়াই লাখ সদস্যের ব্যক্তিগত সেনাবাহিনী ছিল। অর্থাৎ তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর দ্বিগুণ সেনাসদস্য ছিল তাদের। মসলা, তুলা, রেশম, চা, নীলসহ নানা পণ্যের বৈশ্বিক বাণিজ্যে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এর মানবিক মূল্য ছিল অত্যন্ত বেশি।

কোম্পানির শাসনামলে শোষণ, নগদ ফসল চাষে বাধ্য করা এবং রপ্তানিনির্ভর নীতির কারণে দুর্ভিক্ষ আরও তীব্র হয়। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর তাদের শাসনের অবসান ঘটে। পরে ক্ষমতা ব্রিটিশ রাজপরিবারের হাতে হস্তান্তরের পর ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানিটি বিলুপ্ত করে।

একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে সাম্রাজ্য নির্মাতা হয়ে উঠেছিল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইতিহাস সেই কাহিনীই তুলে ধরে। এটি আধুনিক ভারত, ব্রিটেন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করলেও রেখে গেছে গভীর অবিচারের ইতিহাস। আর এবার দ্বিতীয়বারের মতো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই অদ্ভুত পুনরুজ্জীবনেরও সমাপ্তি টানল।

আইকে/টিকে

মন্তব্য করুন