জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’
ছবি: সংগৃহীত
১০:১৩ এএম | ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পারমাণবিক আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি। তিনি এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। তবে সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়াতে দেশ দুটির মধ্যে কোনও চুক্তি হবে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়। অবশ্য উভয় পক্ষই শিগগিরই আবার আলোচনায় বসার কথা জানিয়েছে। খবর বিবিসি
আলবুসাইদি বলেন, দুই পক্ষই নিজ নিজ দেশে পরামর্শ শেষে ‘শিগগিরই’ আলোচনা পুনরায় শুরু করবে। পাশাপাশি আগামী সপ্তাহে ভিয়েনায় কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই আলোচনায় তার দেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। তিনি বলেন, আলোচনায় ‘ভালো অগ্রগতি’ হয়েছে। কিছু বিষয়ে সমঝোতা হলেও অন্য কিছু ইস্যুতে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। তিনি জানান, এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে পরবর্তী দফা আলোচনা হবে।
এই আলোচনার সম্ভাবনা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে হামলার হুমকি বাস্তবায়নের ঝুঁকি কমাতে পারে।
অবশ্য ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণের পর মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, হামলা হলে জোরালো জবাব দেয়া হবে।
দশকের পর দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অভিযোগ করে আসছে, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। ইরান বারবার এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। তবে পারমাণবিক অস্ত্র না থাকা সত্ত্বেও অস্ত্রমানের কাছাকাছি মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা বিশ্বের একমাত্র দেশ ইরান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় ইরান জোর দিয়ে বলেছে যে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহারের অধিকার তাদের রয়েছে। তারা নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করা এবং ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদেশে পাঠানোর মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
তবে কর্মকর্তারা কিছু ছাড়ের প্রস্তাব দিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও তা প্রকাশ করা হয়নি। আলোচিত একটি বিকল্প হলো, তিন থেকে পাঁচ বছরের স্থগিতাদেশের পর আন্তর্জাতিক নজরদারিতে সীমিত মাত্রায় ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেয়া। এছাড়া চুক্তির বিনিময়ে ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন আরাগচি। ইরানি টেলিভিশনকে তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
বিবিসি বলছে, পরোক্ষ এই আলোচনা দুই দফায় হয়। সকালে তিন ঘণ্টার একটি বৈঠক এবং সন্ধ্যায় আরেকটি সংক্ষিপ্ত বৈঠক। ফলাফল নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। আলোচনায় আগের মতোই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসিও এই আলোচনায় যোগ দেন।
চুক্তির জন্য ট্রাম্প কোন শর্ত মেনে নিতে পারেন, তা স্পষ্ট নয়। আট মাস আগে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালানোর পর এখন সামরিক পদক্ষেপ কেন প্রয়োজন হতে পারে, সে ব্যাখ্যাও তিনি পরিষ্কার করেননি। ইরান ইতোমধ্যে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইরাকে মিলিশিয়া ও ইয়েমেনে হুতিদের প্রতি সমর্থন বন্ধের আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেছে।
গত মঙ্গলবার কংগ্রেসে দেয়া স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে সংক্ষেপে ও অস্পষ্টভাবে কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, ইরান এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে যা ‘শিগগিরই’ যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম হবে, যদিও বিস্তারিত দেননি তিনি। গত বছরের হামলার পর ইরান আবার পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি শুরু করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি এবং বলেন, ‘বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষককে’ পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দেয়া যাবে না।
তবে ভাষণের কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক মাধ্যমে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লেখেন, ইরান ‘কোনও পরিস্থিতিতেই’ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।
মার্কিন গণমাধ্যমে নাম প্রকাশ না করা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বা পারমাণবিক স্থাপনায় প্রাথমিক হামলার কথা ভাবছিলেন ট্রাম্প। দেশটির নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই এই পথে হাঁটার কথা ভাবছিলেন তিনি। আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়িকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যেও অভিযান চালানোর নির্দেশ দিতে পারেন- এমন কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান অবশ্য সতর্ক করেছেন, ইরানে হামলা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। তবে ট্রাম্প বলেছেন, জেনারেল ড্যান কেইন মনে করেন এটি ‘সহজেই জেতা’ সম্ভব।
অন্যদিকে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও ইসরায়েলে আঘাত হানা হবে। এই অঞ্চলের যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত দেশগুলো আশঙ্কা করছে, ইরানে হামলা হলে তা বৃহত্তর সংঘাতে রূপ নিতে পারে। তারা সতর্ক করেছে, কেবল বিমান শক্তি দিয়ে দেশটির নেতৃত্ব পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
কেএন/এসএন