ইরানের খারগ দ্বীপ কীভাবে দখলের চেষ্টা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র?
ছবি: সংগৃহীত
০১:০৪ এএম | ০১ এপ্রিল, ২০২৬
পারস্য উপসাগরের উত্তরে অবস্থিত ইরানের প্রধান তেল রফতানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নিতে সেখানে সেনা পাঠাতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে প্রশ্ন হলো, এই পরিকল্পনার নেপথ্যের কারণ কী, কীভাবে এটা কার্যকর করা হতে পারে?
দীর্ঘদিন ধরেই খারগ দ্বীপ ইরানের তেল রফতানির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। দ্বীপটি উপকূল থেকে কিছুটা দূরে এমন এক গভীর জলসীমায় অবস্থিত, যেখানে ‘ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার’ (ভিএলসিসি) নামক বিশাল তেলের ট্যাঙ্কারগুলো সহজেই ভিড়তে পারে। এই ট্যাঙ্কারগুলোর প্রতিটিতে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা যায়। ইরানের তেল রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশই খারগ দ্বীপের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরাকি বিমান বাহিনী খারগ দ্বীপে ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়েছিল। চলতি বছরের ১৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রও খারগ দ্বীপে, তাদের ভাষায় প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তবে এই দ্বীপের তেলের অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা থেকে ছাড় দিয়েছিল মার্কিন বাহিনী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি শেষ পর্যন্ত খারগ দ্বীপে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় তবে সেটি সম্ভবত একটি সাময়িক পদক্ষেপ হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হবে, ইরানের জ্বালানি রফতারি বন্ধ করে দিয়ে দেশটিকে চাপে ফেলা, যাতে তারা বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালীর ওপর থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করে এবং ওয়াশিংটনের দাবিগুলো মেনে নেয়।
তবে ইরান সরকারের কঠোর মনোভাব এবং নতি স্বীকার না করার ইতিহাস বিবেচনায় নিলে, এই পরিকল্পনা আদৌ সফল হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, যেকোনো মার্কিন বাহিনী সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করলে তার দেশের সেনারা তাদের ওপর ‘আগুনের বৃষ্টি’ চালাবে। ইরান খারগ দ্বীপে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এরইমধ্যে আরও জোরদার করেছে। এর মধ্যে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য মিসাইল ব্যাটারিও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ এনে ইরান দাবি করেছে, একদিকে দেশটি শান্তির প্রস্তাব দিচ্ছে, অন্যদিকে এই অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক সেনা পাঠাচ্ছে। প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন নৌ-সেনা এবং ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় দুই হাজার প্যারাস্যুটধারী সৈন্য রয়েছে এই সেনাবহরে।
এই ঘটনা ব্যাপক জল্পনার জন্ম দিয়েছে যে, খারগ দ্বীপ দখল এবং নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এই দুই বাহিনীর একটি অথবা দু’টিকেই ব্যবহার করা হতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে বলা যেতে পারে, প্যারাট্রুপাররা সম্ভবত রাতে আকাশপথে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে মাত্র ২০ বর্গ কিলোমিটারের (৭.৭ বর্গমাইল) এই ছোট দ্বীপটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানগুলো নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে।
কিন্তু তার আগে মার্কিন জাহাজগুলোকে ইরান-নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এরপরে পারস্য উপসাগরের ভেতর দিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার সময় ইরানের অসংখ্য লুক্কায়িত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের নজরদারি এড়িয়েই যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজগুলোকে এগিয়ে যেতে হবে। যে পথেই অবতরণ করুক না কেন, তাদের অ্যান্টি-পারসোনেল মাইন (সৈন্য বিধ্বংসী মাইন) এবং ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোনের মুখে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি খারগ দ্বীপ কোনোভাবে দখল করতেও পারে, এরপরই তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা। কারণ অনির্দিষ্টকাল ধরে তাদের ইরানি মূল ভূখণ্ড থেকে ধেয়ে আসা তীব্র গোলাবর্ষণ মোকাবিলা করতে হবে।
কৃষ্ণ সাগরে অবস্থিত ইউক্রেনের স্নেক আইল্যান্ড বা দ্বীপের সাথে এই পরিস্থিতির তুলনা করা যেতে পারে। ২০২২ সালে ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পরপরই রাশিয়া দ্বীপটি দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু ইউক্রেনীয় মূল ভূখণ্ড থেকে অবিরাম কামানের গোলা ও হামলার মুখে শেষ পর্যন্ত দ্বীপটি ছেড়ে যেত বাধ্য হয় রাশিয়া।
এছাড়া ইরানের ভূখণ্ডে দীর্ঘমেয়াদী যেকোনো মার্কিন দখলদারি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও জনসমর্থন পাবে না। এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনেক সমর্থকও তা পছন্দ করছেন না, কারণ তাদের একাংশ এই প্রতিশ্রুতিতেই ট্রাম্পকে নির্বাচিত করেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আর কখনো এ ধরনের যুদ্ধে জড়াবে না।
অবশ্য এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে, খারগ দ্বীপে সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযান নিয়ে বর্তমানে এত বেশি আলোচনা হচ্ছে যে, এটি কোনো সুদূরপ্রসারী ধোঁকাবাজি বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর কৌশল হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
তবে ইরান এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কাছে এই দ্বীপের কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। পারস্য উপসাগরে আরও কিছু দ্বীপ আছে যেগুলো ওয়াশিংটনের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। এর মধ্যে একটি হলো লারাক দ্বীপ, যা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর আব্বাসের ঠিক উল্টোদিকে এবং হরমুজ প্রণালীর প্রবেশপথেই অবস্থিত।
এছাড়াও রয়েছে কেশম দ্বীপ, যেটি পারস্য উপসাগরের বৃহত্তম দ্বীপ এবং খারগ দ্বীপ থেকে প্রায় ৭৫ গুণ বড়। ধারণা করা হয়, ইরান এখানে মাটির নিচে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ঘাঁটি তৈরি করে রেখেছে। এছাড়া আরও তিনটি দ্বীপ রয়েছে- আবু মুসা, দ্য গ্রেটার এন্ড লেসার টাবস।
এই দ্বীপগুলোর মালিকানা নিয়ে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ থাকলেও বর্তমানে সবগুলোই ইরানের দখলে। অন্যান্য দ্বীপের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরের এই দ্বীপগুলো ইরানের জন্য একটি সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এগুলো ব্যবহার করে ইরান জাহাজ চলাচলে যেমন বাধা দিতে পারে, তেমনি ভৌগোলিক অবস্থানের এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির মোকাবিলা করাও তাদের জন্য সহজ হবে।
ওই অঞ্চলে আরও সৈন্য পাঠানো এবং স্থল অভিযানের হুঁশিয়ারি দেয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প সম্প্রতি আবারও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ চলছে। এই আলোচনার সফল পরিণতিই ‘মার্কিন সামরিক অভিযান বন্ধ’ করতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
যুদ্ধ পঞ্চম সপ্তাহে গড়ালেও ট্রাম্পের প্রকাশ্য বক্তব্যগুলো থেকে পরবর্তী বড় পদক্ষেপ কী হতে পারে, সে বিষয়ে খুব কমই আভাস পাওয়া যাচ্ছে।অনেকের ধারণা, ইরানিদের চেয়ে বেশি মরিয়া হয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই ‘একটি চুক্তি' চাচ্ছেন।
সূত্র: বিবিসি
এমআর/টিএ